হোম / জরুরী মাসায়েল / সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের বিবরণ

সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের বিবরণ

সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের বিবরণ

সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের উপর সকল উলামায়ে কেরামের ইজমা হলো, এটি জায়েয। অসংখ্য হাদীস এর স্বপক্ষে রয়েছে। কিছু বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে।

সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের ব্যাপারে মতানৈক্য

ইমাম আবু হানীফা রহ. বলেন, বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য বের হওয়া এবং নামাজ পড়া সুন্নত নয়। কারণ, সুন্নত হওয়ার জন্য দায়েমীভাবে নবীজীর আমল লাগে। অথচ নবীজী দায়েমীভাবে বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়েননি। বরং অসংখ্যবার শুধু দুআ‘ করেই ক্ষ্যান্ত হয়েছেন। (মাআরিফুস সুনান ৪/৪৯৯)

وقال أبو حنيفة : لا تسن الصلاة للاستسقاء ولا الخروج لها. المغني لابن قدامه 2/284 (الشاملة)

إعلم أن أبا حنيفة قال ليس في الاستسقاء صلاة مسنونة في جماعة فإن صلى الناس وحدانا جاز إنما الاستسقاء الدعاء والاستغفار لقوله تعالى استغفروا ربكم إنه كان غفارا يرسل السماء عليكم مدرارا. عمدة القاري 13/186 (الشاملة)

কিন্তু ইমাম আবু হানীফা রহ. এর বক্তব্যের অর্থ হলো, ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনা করা শুধু নামাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং নামাজ পড়া ছাড়া শুধু দুআ‘ ও ক্ষমা প্রার্থনার দ্বারাও বৃষ্টি প্রার্থনা করা যায়। -দরসে তিরমিযী ২/৩৩৮-৩৩৯; ইনআমুল বারী ৪/২০৭-২০৮

তাই বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ পড়া বৈধ, তাঁর মতে সুন্নত নয়। যেমন, চাদর উল্টিয়ে পরিধান করাও তাঁর মতে সুন্নত নয় (সহীহ্ বুখারীর ১০১৮ নং হাদীস এর দলীল)। আল্লামা আইনী রহ. বলেন,

وقال صاحب ( التوضيح ) تحويل الرداء سنة عند الجمهور وانفرد أبو حنيفة وأنكره ووافقه ابن سلام من قدماء العلماء بالأندلس والسنة قاضية عليه قلت أبو حنيفة لم ينكر التحويل الوارد في الأحاديث إنما أنكر كونه من السنة لأن تحويله كان لأجل التفاؤل لينقلب حالهم من الجدب إلى الخصب فلم يكن لبيان السنة

ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে যে বলা হয়, তিনি চাদর উল্টানোকে অস্বীকার করেন – বিষয়টি সঠিক নয়। বরং তিনি তা সুন্নত হওয়ার কথা বলেন না। তা একটি বৈধ আমল মাত্র। -উমদাতুল কারী ৫/২৪৫ (দারুল ফিকর)

সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর বক্তব্যের উদ্দেশ্য

ইমাম তিরমিযী রহ. সহ আরো অনেকেই ইমাম আবু হানীফা রহ. এর উক্ত বক্তব্য বুঝতে সক্ষম হননি তাই ইমাম আবু হানীফা রহ. সম্পর্কে বীরুপ মন্তব্য করেছেন। যেমন ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন,

وَقَالَ النُّعْمَانُ أَبُو حَنِيفَةَ لاَ تُصَلَّى صَلاَةُ الاِسْتِسْقَاءِ وَلاَ آمُرُهُمْ بِتَحْوِيلِ الرِّدَاءِ وَلَكِنْ يَدْعُونَ وَيَرْجِعُونَ بِجُمْلَتِهِمْ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى خَالَفَ السُّنَّةَ ‏.‏

আবু হানিফা নুমান বলেন, বৃষ্টি প্রার্থনার নামায পড়তে হবে না। আমি চাদর পরিবর্তনের আদেশও দেই না। বরং তারা স্বাভাবিকভাবেই দুআ করবে। আবু ঈসা বলেন, তিনি সুন্নাতের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। -সুনানে তিরমিযী ৫৫৯ নং হাদীস।

অথচ ইমাম আবু হানীফা রহ. এর বক্তব্য সুস্পষ্ট যে, বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য নামায পড়তেই হবে এমন কোন বিষয় নয়। বরং নামায ছাড়াও বৃষ্টি প্রার্থনা করা যায়। যেমনটি আমাদের সামনে উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে সুস্পষ্ট। তাই ইমাম তিরমিযী রহ. “তিনি সুন্নাতের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন” –কথা বলাটা আমাদের অযৌক্তিক বলা ছাড়া কোন উপায় নেই।

সালাত ছাড়াও বৃষ্টি প্রার্থনা করা যায় মর্মে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দলীলসমূহ

فَقُلۡتُ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّکُمۡ ؕ اِنَّهٗ کَانَ غَفَّارًا ﴿ۙ۱۰﴾ یُّرۡسِلِ السَّمَآءَ عَلَیۡکُمۡ مِّدۡرَارًا ﴿ۙ۱۱

আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। -সূরা নূহ ১০,১১

عن عطاء بن أبي مروان الأسلمي عن أبيه قال : خرجنا مع عمر بن الخطاب نستسقي فما زاد على الاستغفار . المصنف لابن أبي شيبة: 8428

হযরত উমর রা. শুধু ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করেছেন। -মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮৪২৮

عن الشعبي أن عمر خرج يستسقي فصعد المنبر فقال : {استغفروا ربكم إنه كان غفارا يرسل السماء عليكم مدرارا ويمددكم بأموال وبنين ويجعل لكم جنات ويجعل لكم انهارا} واستغفروا ربكم إنه كان غفارا ثم نزل فقيل له : يا أمير المؤمنين ! لو استسقيت فقال : لقد طلبتُ بمجاديح السماء التي يستنزل بها القطر . المصنف لابن أبي شيبة: 8429

وفي النهاية في غريب الحديث: وفي حديث عمر رضي اللّه عنه [ لقد اسْتَسْقَيْتُ بِمجَادِيح السماء ] المجاَدِيح : واحِدُها مِجْدَح والياء زائدة للإشباع والقياس أن يكون واحدها مِجْدَاح فأمّا مِجْدَح فجمْعُه مَجادِح . والمِجْدَح : نَجْم من النجوم . قِيلَ هو الدَّبَران . وقيل هو ثلاثة كواكب كالأثَافِي تَشْبِيهاً بالمِجْدح الذي له ثلاث شُعَب وهو عند العرب من الأنْواء الدَّالَّة عَلَى المطر فَجعل الاستِغفار مُشَبَّهاً بالأنواء مُخاطَبَة لهم بما يعرفونه لا قوْلاً بالأنْواء . وجاء بلفظ الجمْع لأنه أراد الأنْواء جَمِيعَها التي يَزْعُمون أنَّ من شأنِها المطَر.

একদা হযরত উমরা রা. বের হয়ে মিম্বরে উঠে বৃষ্টি প্রার্থনা করলেন অত:পর নেমে গেলেন।….. -মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮৪২৯

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم اسْتَسْقَى فَقَلَبَ رِدَاءَهُ‏.‏

‘আবদুল্লাহ্ ইবনু যায়িদ (রাযি.) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির জন্য দু‘আ করেন এবং নিজের চাদর উল্টিয়ে দেন। -সহীহ্ বুখারী ১০১১, ১০০৫

এখানে নামাজ পড়ার কথা নেই। বরং শুধু বৃষ্টি প্রার্থনার কথা রয়েছে।

عَنْ أَنَسٍ قَالَ بَيْنَمَا النَّبِيُّ يَخْطُبُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِذْ قَامَ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم هَلَكَ الْكُرَاعُ وَهَلَكَ الشَّاءُ فَادْعُ اللهَ أَنْ يَسْقِيَنَا فَمَدَّ يَدَيْهِ وَدَعَا.

আনাস (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক জুমু‘আহর দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (পানির অভাবে) ঘোড়া মরে যাচ্ছে, ছাগল বকরীও মরে যাচ্ছে। কাজেই আপনি দু’আ করুন, যেন আল্লাহ্ আমাদেরকে বৃষ্টি দান করেন। তখন তিনি দু’ হাত প্রসারিত করলেন এবং দু‘আ করলেন। -সহীহ্ বুখারী ৯৩২

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ أَصَابَتْ النَّاسَ سَنَةٌ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَبَيْنَا النَّبِيُّ يَخْطُبُ فِي يَوْمِ جُمُعَةٍ قَامَ أَعْرَابِيٌّ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم هَلَكَ الْمَالُ وَجَاعَ الْعِيَالُ فَادْعُ اللهَ لَنَا فَرَفَعَ يَدَيْهِ وَمَا نَرَى فِي السَّمَاءِ قَزَعَةً فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ مَا وَضَعَهَا حَتَّى ثَارَ السَّحَابُ أَمْثَالَ الْجِبَالِ ثُمَّ لَمْ يَنْزِلْ عَنْ مِنْبَرِهِ حَتَّى رَأَيْتُ الْمَطَرَ يَتَحَادَرُ عَلَى لِحْيَتِهِ فَمُطِرْنَا يَوْمَنَا ذَلِكَ وَمِنَ الْغَدِ وَبَعْدَ الْغَدِ وَالَّذِي يَلِيهِ حَتَّى الْجُمُعَةِ الْأُخْرَى

وَقَامَ ذَلِكَ الْأَعْرَابِيُّ أَوْ قَالَ غَيْرُهُ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم تَهَدَّمَ الْبِنَاءُ وَغَرِقَ الْمَالُ فَادْعُ اللهَ لَنَا فَرَفَعَ يَدَيْهِ فَقَالَ اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَا فَمَا يُشِيرُ بِيَدِهِ إِلَى نَاحِيَةٍ مِنْ السَّحَابِ إِلاَّ انْفَرَجَتْ وَصَارَتْ الْمَدِينَةُ مِثْلَ الْجَوْبَةِ وَسَالَ الْوَادِي قَنَاةُ شَهْرًا وَلَمْ يَجِئْ أَحَدٌ مِنْ نَاحِيَةٍ إِلاَّ حَدَّثَ بِالْجَوْدِ.

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে সময় কোন এক জুমু‘আহর দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। তখন এক বেদুইন উঠে দাঁড়াল এবং আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! (বৃষ্টির অভাবে) সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পরিবার পরিজনও অনাহারে রয়েছে। তাই আপনি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য দু‘আ করুন।

তিনি দু’ হাত তুললেন। সে সময় আমরা আকাশে এক খন্ড মেঘও দেখিনি। যাঁর হাত আমার প্রাণ, তাঁর শপথ (করে বলছি)! (দু‘আ শেষে) তিনি দু’ হাত (এখনও) নামান নি, এমন সময় পাহাড়ের ন্যায় মেঘের বিরাট বিরাট খন্ড উঠে আসল। অতঃপর তিনি মিম্বার হতে নীচে নামেননি, এমন সময় দেখতে পেলাম তাঁর দাড়ির উপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। সে দিন আমাদের এখানে বৃষ্টি হল। এর পরে ক্রমাগত দু’দিন এবং পরবর্তী জুমু‘আহ পর্যন্ত প্রত্যেক দিন।

(পরবর্তী জুমু‘আহর দিন) সে বেদুইন অথবা অন্য কেউ উঠে দাঁড়াল এবং আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! (বৃষ্টির কারণে) এখন আমাদের বাড়ি ঘর ধ্বসে পড়ছে, সম্পদ ডুবে যাচ্ছে। তাই আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট দু‘আ করুন। তখন তিনি দু’ হাত তুললেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহ্ আমাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় (বৃষ্টি দাও), আমাদের উপর নয়।

(দু‘আর সময়) তিনি মেঘের এক একটি খন্ডের দিকে ইশারা করছিলেন, আর সেখানকার মেঘ কেটে যাচ্ছিল। এর ফলে চতুর্দিকে মেঘ পরিবেষ্টিত অবস্থায় ঢালের ন্যায় মদিনার আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলে এবং কানাত উপত্যকার পানি একমাস ধরে প্রবাহিত হতে লাগল, তখন (মদিনার) চারপাশের যে কোন অঞ্চল হতে যে কেউ এসেছে, সে এ প্রবল বৃষ্টির কথা আলোচনা করেছে। -সহীহ্ বুখারী ৯৩৩

شَرِيكُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي نَمِرٍ، أَنَّهُ سَمِعَ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، يَذْكُرُ أَنَّ رَجُلاً، دَخَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ مِنْ باب كَانَ وُجَاهَ الْمِنْبَرِ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَائِمٌ يَخْطُبُ فَاسْتَقْبَلَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَائِمًا فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلَكَتِ الْمَوَاشِي وَانْقَطَعَتِ السُّبُلُ، فَادْعُ اللَّهَ يُغِيثُنَا‏.‏ قَالَ فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَيْهِ فَقَالَ ‏”‏اللَّهُمَّ اسْقِنَا، اللَّهُمَّ اسْقِنَا، اللَّهُمَّ اسْقِنَا ‏”‏‏.‏ قَالَ أَنَسٌ وَلاَ وَاللَّهِ مَا نَرَى فِي السَّمَاءِ مِنْ سَحَابٍ وَلاَ قَزَعَةً وَلاَ شَيْئًا، وَمَا بَيْنَنَا وَبَيْنَ سَلْعٍ مِنْ بَيْتٍ وَلاَ دَارٍ، قَالَ فَطَلَعَتْ مِنْ وَرَائِهِ سَحَابَةٌ مِثْلُ التُّرْسِ، فَلَمَّا تَوَسَّطَتِ السَّمَاءَ انْتَشَرَتْ ثُمَّ أَمْطَرَتْ‏.‏ قَالَ وَاللَّهِ مَا رَأَيْنَا الشَّمْسَ سِتًّا

ثُمَّ دَخَلَ رَجُلٌ مِنْ ذَلِكَ الْبَابِ فِي الْجُمُعَةِ الْمُقْبِلَةِ، وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَائِمٌ يَخْطُبُ، فَاسْتَقْبَلَهُ قَائِمًا فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلَكَتِ الأَمْوَالُ وَانْقَطَعَتِ السُّبُلُ، فَادْعُ اللَّهَ يُمْسِكْهَا، قَالَ فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَيْهِ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَا، اللَّهُمَّ عَلَى الآكَامِ وَالْجِبَالِ وَالآجَامِ وَالظِّرَابِ وَالأَوْدِيَةِ وَمَنَابِتِ الشَّجَرِ ‏”‏‏.‏ قَالَ فَانْقَطَعَتْ وَخَرَجْنَا نَمْشِي فِي الشَّمْسِ‏.‏ قَالَ شَرِيكٌ فَسَأَلْتُ أَنَسًا أَهُوَ الرَّجُلُ الأَوَّلُ قَالَ لاَ أَدْرِي‏.‏

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি জুমু’আহ’র দিন মিম্বরের সোজাসুজি দরওয়াজা দিয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দাঁড়িয়ে খুৎবা দিচ্ছিলেন। সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! গবাদি পশু ধ্বংস হয়ে গেল এবং রাস্তাগুলোর চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। সুতরাং আপনি আল্লাহর কাছে দু’আ করুন, যেন তিনি আমাদের বৃষ্টি দেন।

বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর উভয় হাত তুলে দু’আ করলেন, হে আল্লাহ্! বৃষ্টি দিন, হে আল্লাহ্! বৃষ্টি দিন, হে আল্লাহ্! বৃষ্টি দিন। আনাস (রাযি.) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা তখন আকাশে মেঘমালা, মেঘের চিহ্ন বা কিছুই দেখতে পাইনি। অথচ সাল’আ (মদিনার একটি পাহাড়) পর্বত ও আমাদের মধ্যে কোন ঘর-বাড়ি ছিল না।

আনাস (রাযি.) বলেন, হঠাৎ সাল’আ পর্বতের পিছন হতে ঢালের মত মেঘ বেরিয়ে এল এবং তা মধ্য আকাশে পৌঁছে বিস্তৃত হয়ে পড়ল। অতঃপর বর্ষণ শুরু হল। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা ছয়দিন সূর্য দেখতে পাইনি। অতঃপর এক ব্যক্তি পরবর্তী জুমু’আহ’র দিন সে দরজা দিয়ে (মসজিদে) প্রবেশ করল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন দাঁড়িয়ে খুৎবাহ দিচ্ছিলেন।

লোকটি দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! ধন-সম্পদ ধ্বংস হয়ে গেল এবং রাস্তাঘাটও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কাজেই আপনি আল্লাহর নিকট বৃষ্টি বন্ধের জন্য দু’আ করুন। আনাস (রাযি.) বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উভয় হাত তুলে দু’আ করলেন, হে আল্লাহ্! আমাদের আশেপাশে, আমাদের উপর নয়; টিলা, পাহাড়, উচ্চভূমি, মালভূমি, উপত্যকা এবং বনভূমিতে বর্ষণ করুন।

আনাস (রাযি.) বলেন, এতে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল এবং আমরা (মাসজিদ হতে বেরিয়ে) রোদে চলতে লাগলাম। শরীক (রহ.) (বর্ণনাকারী) বলেন, আমি আনাস (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এ লোকটি কি আগের সেই লোকটি? তিনি বললেন, আমি জানি না। -সহীহ্ বুখারী ১০১৩

قَالَ يَحْيَى بْنُ سَعِيدٍ سَمِعْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، قَالَ أَتَى رَجُلٌ أَعْرَابِيٌّ مِنْ أَهْلِ الْبَدْوِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَلَكَتِ الْمَاشِيَةُ هَلَكَ الْعِيَالُ هَلَكَ النَّاسُ‏.‏ فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَيْهِ يَدْعُو، وَرَفَعَ النَّاسُ أَيْدِيَهُمْ مَعَهُ يَدْعُونَ، قَالَ فَمَا خَرَجْنَا مِنَ الْمَسْجِدِ حَتَّى مُطِرْنَا، فَمَا زِلْنَا نُمْطَرُ حَتَّى كَانَتِ الْجُمُعَةُ الأُخْرَى، فَأَتَى الرَّجُلُ إِلَى نَبِيِّ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، بَشِقَ الْمُسَافِرُ، وَمُنِعَ الطَّرِيقُ‏.‏

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক বেদুঈন জুমু‘আহ’র দিন রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! (অনাবৃষ্টিতে) পশুগুলো মরে যাচ্ছে, পরিবার-পরিজন মারা যাচ্ছে, মানুষ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু‘আর জন্য দু’হাত উঠালেন। লোকজনও দু‘আর জন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে হাত উঠিয়ে দু‘আ করতে লাগলেন।

বর্ণনাকারী বলেন, আমরা মাসজিদ হতে বের হবার পূর্বেই বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেল, এমন কি পরবর্তী জুমু‘আ পর্যন্ত আমাদের উপর বৃষ্টি হতে থাকল। তখন লোকটি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! মুসাফির ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে, রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেছে। -সহীহ্ বুখারী ১০২৯

عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ ـ رضى الله عنه ـ كَانَ إِذَا قَحَطُوا اسْتَسْقَى بِالْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَقَالَ اللَّهُمَّ إِنَّا كُنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِنَبِيِّنَا فَتَسْقِينَا وَإِنَّا نَتَوَسَّلُ إِلَيْكَ بِعَمِّ نَبِيِّنَا فَاسْقِنَا‏.‏ قَالَ فَيُسْقَوْنَ‏.‏

আনাস ইবনু মালিক (রাযি.) হতে বর্ণিত, ‘উমার ইবনু খাত্তাব (রাযি.) অনাবৃষ্টির সময় ‘আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রাযি.)-এর ওয়াসীলাহ দিয়ে বৃষ্টির জন্য দু‘আ করতেন এবং বলতেন, হে আল্লাহ্! (আগে) আমরা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর ওয়াসীলাহ দিয়ে দু‘আ করতাম এবং আপনি বৃষ্টি দান করতেন। এখন আমরা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চাচার ওয়াসীলাহ দিয়ে দু‘আ করছি, আপনি আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। বর্ণনাকারী বলেন, দু‘আর সাথে সাথেই বৃষ্টি বর্ষিত হত। -সহীহ্ বুখারী ১০১০

عَنْ شُرَحْبِيلَ بْنِ السِّمْطِ، أَنَّهُ قَالَ لِكَعْبٍ يَا كَعْبُ بْنَ مُرَّةَ حَدِّثْنَا عَنْ رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ وَاحْذَرْ ‏.‏ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ اسْتَسْقِ اللَّهَ فَرَفَعَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ يَدَيْهِ فَقَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مَرِيئًا مَرِيعًا طَبَقًا عَاجِلاً غَيْرَ رَائِثٍ نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَمَا جَمَّعُوا حَتَّى أُجِيبُوا ‏.‏ قَالَ فَأَتَوْهُ فَشَكَوْا إِلَيْهِ الْمَطَرَ فَقَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ تَهَدَّمَتِ الْبُيُوتُ ‏.‏ فَقَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ حَوَالَيْنَا وَلاَ عَلَيْنَا ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَجَعَلَ السَّحَابُ يَنْقَطِعُ يَمِينًا وَشِمَالاً ‏.‏

শুরাহবীল ইবনুস সিমত (রহ) থেকে বর্ণিত, তিনি কাব (রাঃ) কে বলেন, হে কাব ইবনু মুররা! আমাদের নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস বর্ণনা করুন এবং সতর্কতা অবলম্বন করুন। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আল্লাহ্‌র নিকট বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করুন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দুহাত তুলে দুআ করেনঃ আল্লাহুম্মা আসকিনা গাইছান মারীআন মারীআন তবাকান আজিলান গাইরা রাইছিন নাফিআন গাইরা দাররিন (হে আল্লাহ্! আমাদেরকে এমন বৃষ্টির পানি দান করুন যা সুপেয়, ফসল উৎপাদক, পর্যাপ্ত, বিলম্বে নয়, অবলম্বনে, উপকারী এবং ক্ষতিকর নয়)।

কাব (রাঃ) বলেন, জুমুআহর সালাত (নামায/নামাজ) শেষ না হতেই বৃষ্টি হয়ে গেলো। পরে লোকেরা তাঁর নিকট এসে অতিবৃষ্টির অভিযোগ করলো এবং বললো, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! বাড়িঘর ধ্বসে যাচ্ছে। তিনি বলেনঃ হে আল্লাহ্! আমাদের উপর নয়, আমাদের আশেপাশে বর্ষিত হোক। রাবী বলেন, তৎক্ষণাৎ মেঘমালা টুকরা টুকরা হয়ে ডানে-বামে সরে গেলো। -সুনানে ইবনে মাজাহ্ ১২৬৯

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ، قَالَ أَتَتِ النَّبِيَّ صلي الله عليه وسلم بَوَاكِي فَقَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُغِيثًا مَرِيئًا نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ عَاجِلاً غَيْرَ آجِلٍ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَأَطْبَقَتْ عَلَيْهِمُ السَّمَاءُ ‏.‏

জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে কতিপয় লোক (বৃষ্টি না হওয়ায়) ক্রন্দনরত অবস্থায় এলে তিনি দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ! আমাদেরকে বিলম্বে নয় বরং তাড়াতাড়ি ক্ষতিমুক্ত-কল্যাণময়, তৃপ্তিদায়ক, সজীবতা দানকারী, মুষল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করো। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তাদের উপর আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায় (এবং বৃষ্টি হয়)। -আবু দাউদ ১১৬৯

عَنْ آبِي اللَّحْمِ، أَنَّهُ رَأَى رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عِنْدَ أَحْجَارِ الزَّيْتِ يَسْتَسْقِي وَهُوَ مُقْنِعٌ بِكَفَّيْهِ يَدْعُو ‏

আবুল লাহম (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আহজরুয-যাইত নামক জায়গায় বৃষ্টি প্রার্থনা করতে দেখলেন। তিনি দুই হাত তুলে দু’আ করলেন। -তিরমিযী ৫৫৭

এছাড়াও আরো অসংখ্য দলীল রয়েছে যেগুলোতে বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু দুআ‘ করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। উমদাতুল কারী (৫/২৫৯-২৬০) তে এরকম আরো ৮টি হাদীসের উল্লেখ রয়েছে। কেউ চাইলে দেখে নিতে পারেন।

অত:পর আল্লামা আইনী রহ. বলেন,

فهذه الأحاديث والآثار كلها تشهد لأبي حنيفة أن الاستسقاء استغفار ودعاء وأجيب عن الأحاديث التي فيها الصلاة أنه فعلها مرة وتركها أخرى وذا لا يدل على السنة وإنما يدل على الجواز

এই সকল হাদীস ও আছার এর প্রত্যেকটি ইমামে আ‘যম আবু হানীফা রহ. মতকে সমর্থন করে যে, বৃষ্টি প্রার্থনা হলো ক্ষমা প্রার্থনা ও দুআ‘। তাহলে যে সকল হাদীসে নামাযের কথা রয়েছে তার উত্তর হলো, বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়া বৈধ, তাঁর (ইমাম আবু হানীফার) মতে সুন্নত নয়। -উমদাতুল কারী ৫/২৬১

বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ কি সুন্নত?

এ পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে যে, ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মতে তা একটি বৈধ আমল। সুন্নত হলো, দুআ‘ ইস্তেগফার। আর ইমাম আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ ও বাকী তিন ইমামের মতে তা সুন্নত। ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মতের স্বপক্ষে দলীলগুলো পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।

ইস্তিসকার নামাজের হাদিস

আর নামাজ সুন্নত হওয়ার স্বপক্ষের দলীল হলো, ঐ হাদীসসমূহ যেগুলোতে বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য নামায পড়ার বিবরণ রয়েছে। যথা: বুখারী ১০১২, ১০২২, ১০২৪, ১০২৫; তিরমিযী, ৫৫৬

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ زَيْدٍ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم خَرَجَ إِلَى الْمُصَلَّى فَاسْتَسْقَى، فَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ، وَقَلَبَ رِدَاءَهُ، وَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ‏.‏ بخاري: 1012

عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ، خَرَجَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ يَزِيدَ الأَنْصَارِيُّ وَخَرَجَ مَعَهُ الْبَرَاءُ بْنُ عَازِبٍ وَزَيْدُ بْنُ أَرْقَمَ رضى الله عنهم فَاسْتَسْقَى، فَقَامَ بِهِمْ عَلَى رِجْلَيْهِ عَلَى غَيْرِ مِنْبَرٍ فَاسْتَغْفَرَ، ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ يَجْهَرُ بِالْقِرَاءَةِ وَلَمْ يُؤَذِّنْ، وَلَمْ يُقِمْ‏.‏ بخاري: 1022

عَنْ عَبَّادِ بْنِ تَمِيمٍ عَنْ عَمِّهِ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَسْتَسْقِي فَتَوَجَّهَ إِلَى الْقِبْلَةِ يَدْعُو وَحَوَّلَ رِدَاءَهُ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ جَهَرَ فِيهِمَا بِالْقِرَاءَةِ. بخاري: 1024

عَنْ عَبَّادِ بْنِ تَمِيمٍ، عَنْ عَمِّهِ، قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ خَرَجَ يَسْتَسْقِي قَالَ فَحَوَّلَ إِلَى النَّاسِ ظَهْرَهُ، وَاسْتَقْبَلَ الْقِبْلَةَ يَدْعُو، ثُمَّ حَوَّلَ رِدَاءَهُ، ثُمَّ صَلَّى لَنَا رَكْعَتَيْنِ جَهَرَ فِيهِمَا بِالْقِرَاءَةِ‏.‏ بخاري: 1025

عن عباد بن تميم عن عمه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم خرج بالناس يستسقي فصلى بهم ركعتين جهر بالقراءة فيهما وحول رداءه ورفع يديه واستسقى واستقبل القبلة. ترمذي: 556

তো যাইহোক! সালাতুল ইসতিসকা সুন্নত হলেও কোন সমস্যা নেই। কারণ, ইমাম আবু হানীফা রহ. তো তা পড়া জায়েয হওয়ার কথা বলেন। মতনৈক্য শুধু সুন্নত হওয়া না হওয়া নিয়ে। ইমাম আবু হানীফা রহ. সুন্নত না বলার কারণ হলো, নামাজ পড়ার দলীলগুলো বৈধতাকে প্রমাণ করে, সুন্নত হওয়া কে নয়। তাঁর মতে সুন্নত শুধু দুআ‘ ইস্তেগফার। যার স্বপক্ষে অসংখ্য দলীল বিদ্যমান রয়েছে। কিছু আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। আরো বিস্তারিত দেখুন, মাআরিফুস সুনান ৪/৪৯৭-৫০৫

তাছাড়া পূর্বে উল্লিখিত হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে মাত্র একবার বৃষ্টির জন্য নামাজ পড়েছেন (মাআরিফুস সুনান ৪/৪৯৭; বাযলুল মাজহুদ ৫/২৮৩-২৮৪ হাদীস ১১৭৩)। বাকী সময় তিনি শুধু দুআ‘র মাধ্যমেই বৃষ্টি প্রার্থনা করেছেন।

অতএব, নামাজের মাধ্যমেও বৃষ্টি প্রার্থনা করা যায়, আবার শুধু দুআর মাধ্যমেও করা যায়। যেহেতু নামাজের মাধ্যমেও বৃষ্টি প্রার্থনা করা যায় তাই নিম্নে আমরা সালাতুল ইসতিসকা বা বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজের বিস্তারিত বিবরণ জেনে নিব।

বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজ বা বৃষ্টির নামাজের নিয়ম বা সালাতুল ইসতিসকা কিভাবে করতে হয়?

১. ইসতিসকার দুই রাকাত নামাজ আযান-ইকামত ছাড়া ঈদগাহে বা খোলা মাঠে (মাআরিফুস সুনান ৪/৫০৩) পড়বে। নামাজে উচ্চস্বরে কেরাত পড়বে। -সহীহ্ বুখারী, ১০১২, ১০২২, ১০২৪, ১০২৫; তিরমিযী, ৫৫৬; ৫৫৮; আবু দাউদ, ১১৭৩

২. চাদর উল্টাবে। সহীহ্ বুখারী, ১০১১, ১০১২, ১০২৪, ১০২৫

যদি চাদর না থাকে তাহলে আবাকাবা থাকলে তা উল্টিয়ে পরিধান করবে। -রদ্দুল মুহতার ৩/৭১ (যাকারিয়া)

চাদর উল্টানো এবং দুআর সময় উল্টাহাত করা আসলে এক প্রকার কর্মগত দুআ। অর্থাৎ, হে মওলা! তুমি আমাদের এই চাদর ওহাত উল্টানোর মত আমাদের বর্তমান দুরবস্থাও পাল্টে দাও। আমাদের অনাবৃষ্টির অবস্থাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দাও।

أما تقليب الرداء فوجهه ما جاء في كنز العمال: 23546 ثم قلب رداءه لتنقلب السَنَةُ. أي لكي ينقلب القحط إلى الخصب.

হানাফী মাযহাবে শুধু ইমাম সাহেব চাদর উল্টাবেন। বাকী তিন মাযহাবে ইমাম মুক্তাদী সকলেই চাদর উল্টিয়ে নিবে (মুসনাদে আহমদ ১৬৪৬৫)। বিস্তারিত দেখুন, দরসে তিরমিযী ২/৩৪০-৩৪২; ই‘লাউস সুনান; মাআরিফুস সুনান; উমদাতুল কারী।

চাদর উল্টানোর পদ্ধতি হলো, নিচের অংশ উপরে এবং উপরের অংশ নিচে, ডানের অংশ বামে এবং বামের অংশ ডানে করে নেয়া (ইবনে মাজাহ ১২৬৮; আবু দাউদ ১১৬৩, ১১৬৪)। -উমদাতুল কারী হাদীস ১০০৫ এর অধিনে এবং দরসে তিরমিযী ২/৩৪০

শুধু ডান-বাম পরিবর্তন করলেও চলবে। -বাযলুল মাজহুদ ৫/২৬৪ (হাদীস: ১১৬৪ এর অধিনে)

চাদর উল্টানোর সময় হলো, খুতবার কিছু অংশ পড়ার পর। কেউ কেউ খুতবা শেষ করার পর চাদর উল্টানোর কথা বলেন। -উমদাতুল কারী ৫/২৪৫ (হাদীস ১০০৫); বাযলুল মাজহুদ ৫/২৬৬ (হাদীস: ১১৬৬)

তবে খুতবা শেষ করার পর এমনকি দুআ‘রও পরে চাদর উল্টানো মর্মে হাদীস রয়েছে। -সহীহ্ বুখারী, ১০২৮; সহীহ্ মুসলিম, ৮৯৪; আবু দাউদ, ১১৬৭; ইবনে মাজাহ ১২৬৮; ফাতাওয়া তাতারাখঅনিয়া ২/৬৬২ (৩৫৩০); ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/২০৭-২০৮ (শাব্বীর আহমদ কাসেমী)

৩. ইমাম সহ সকলেই হাত উঠিয়ে দুআ‘ করবে। এক্ষেত্রে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাত অনেক উচুতে উঠানোর বর্ণনা রয়েছে। -সহীহ্ বুখারী, ১০২৯, ১০৩০, ১০৩১; সহীহ্ মুসলিম, ৮৯৫-৮৯৬; আবু দাউদ, ১১৬৮

দুআ‘র সময় হাতের পিঠ আকাশের দিকে করার বর্ণনাও রয়েছে (সহীহ্ মুসিলম ৮৯৬)।

৪. ঈদের নামাজের মত নামাজ পড়বে। -তিরমিযী, ৫৫৮

হানাফী মাযহাবে ঈদের নামাজের মত বলতে শুধু দুই রাকাত নামাজ উচ্চস্বরে কেরাত পড়ে আদায় করবে, অতিরিক্ত কোন তাকবীর নেই। আর শাফেয়ী মাযহাবে হুবাহু ঈদের নামাজের মত অতিরিক্ত বারো তাকবীরের সাথে পড়বে। সকলেই উক্ত হাদীস দিয়ে দলীল পেশ করেন।

তবে হানাফীগণ বলেন, ঈদের মত মানে দুই রাকাত ও উচ্চস্বরে কেরাত পড়ার দিক থেকে। কারণ, অন্য হাদীসে অতিরিক্ত তাকবীরের কথা নেই।

عن أنس بن مالك أن رسول الله صلى الله عليه و سلم استسقى فخطب قبل الصلاة واستقبل القبلة وحول رداءه ثم نزل فصلى ركعتين لم يكبر فيهما إلا تكبيرة تكبيرة

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতুল ইসতিসকা আদায় করলেন কিন্তু তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া আর কোন তাকবীর বলেননি। -আল মু‘জামুল আওসাত ৯১০৮ (দারুল হারামাইন) আরো দেখুন, কানযুল উম্মাল, ২৩৫৪৬

তবে অতিরিক্ত তাকবীর বলুক বা না বলুক দুইটাই জায়েয।

وكيفما فعل كان جائزا حسنا. المغني لابن قدامه 2/284 (الشاملة)

৫. সাধারণ পোশাক পরে বিনয় ও নম্রতা সহকারে ঈদগাহে আসবে। -তিরমিযী ৫৫৮, ৫৫৯

৬. সূরা আ‘লা এবং গাশিয়া দিয়ে নামাজ পড়াবে। -তিরমিযী ৫৫৮

৭. আগে থেকে সালাতুল ইসতিসকার ঘোষণা করে মানুষদেরকে জানিয়ে দিবে। যেমনটি ঈদের নামাজে করা হয়। -তিরমিযী ৫৫৮

وينادى لها الصلاة جامعة كقولهم في صلاة العيد والكسوف. المغني لابن قدامه 2/285 (الشاملة)

৮. সালাতুল ইসতিসকার সময় ঈদের নামাজের সময়। -তিরমিযী ৫৫৮। তবে মাকরুহ সময় ব্যতিত যে কোন সময়ই তা পড়া যায়।

وليس لصلاة الاستسقاء وقت معين إلا أنها لا تفعل في وقت النهي بغير خلاف لأن وقتها متسع فلا حاجة إلى فعلها في وقت النهي والأولى فعلها في وقت العيد. المغني لابن قدامه 2/286 (الشاملة) ويراجع عمدة القاري 5/258 (حديث 1012)

অবশ্য হাদীসে সূর্য উঠার পর পড়ার কথা রয়েছে। -আবু দাউদ, ১১৭৩

৯. খুতবা দিবে। তবে খুতবা নামাজের আগে দিবে না পরে দিবে মতানৈক্য রয়েছে। কারণ, এ সম্পর্কে দুই ধরণের বর্ণনা রয়েছে। ইবনে মাজাহ ১২৬৮ নম্বর হাদীসে নামাজের পরের কথা রয়েছে। আর আবু দাউদ ১১৭৩ নম্বর হাদীসে নামাজের আগের কথা রয়েছে। এবং সহীহ্ বুখারী ১০২৫ নম্বর হাদীসে আগে দুআ‘ করা এবং চাদর উল্টানোর কথা রয়েছে। এখান থেকেও খুতবা আগে হওয়া বুঝা যায়, কিংবা খুতবা না হওয়া বুঝা যায়। তাছাড়া আবু দাউদ ১১৬৫; ইবনে মাজাহ ১২৬৬ তে খুতবা ছাড়াও সালাতুল ইসতিসকার সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।

তাই খুতাবা নামাজের আগে পরে উভয়ভাবে হতে পারে এবং খুতবা ছাড়াও সালাতুল ইসতিসকা পড়ার সুযোগ রয়েছে। কারণ, সালাতুল ইসতিসকাতে খুতবা পড়া ওয়াজিব নয়। তবে নামাজের পরে খুতবা দিয়েই শেষ করা সুন্নত। কারণ, তিরমিযী শরীফের ৫৫৮ নম্বর হাদীসে বলা হয়েছে, সালাতুল ইসতিসকা এটি ঈদের নমাজের মতই। আর ঈদের নামাজে নামাজের পরে খুতবা পড়তে হয়।

ولكن وقع عند أحمد في حديث عبد الله بن زيد التصريح بأنه بدأ بالصلاة قبل الخطبة والجمع بينهما أنه محمول على الجواز والمستحب تقديم الصلاة لأحاديث أخر. عمدة القاري، حديث: 1012، ويراجع المغني لابن قدامه 2/286 مشروعية الخطبة لصلاة الاستسقاء

ইসতিসকার নামাজের খুতবা কয়টি এটা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। (দেখুন, বাযলুল মাজহুদ ৫/২৭০ হাদীস ১১৬৭)

যারা দুইটার কথা বলেন (এর মধ্যে ইমাম শাফেয়ী ও মুহাম্মদ রহ. রয়েছেন) তাদের দলীল তিরমিযী শরীফের ৫৫৮ নম্বর হাদীস। আর যারা বলেন খুতবা একটা দিবে (এটাই হানাফী মাযহাবের ফাতওয়া) তাদের বক্তব্য হলো যে হাদীসগুলোতে সালাতুল ইসতিসকাতে নবীজীর খুতবা দেওয়ার কথা রয়েছে সেখানে দুই খুতবার কথা নেই। শুধু খুতবা দিয়েছেন এমন কথা রয়েছে। যদি দুই খুতবা দিতেন তাহলে অবশ্যই তার বিবরণ আসত। তবে খুতবা একটা বা দুইটা দিতে কোন সমস্যা নেই।

ولا صريح في المرويات يوافق قول محمد أنها خطبتان. بذل المجهود 5/281 حديث 1173

১০. প্রথম দিন নামাজের পর বৃষ্টি না হলে পর পর আরো দুই দিন নামাজ পড়বে। আর যদি নামাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর বৃষ্টি হয়ে যায় তবুও শুকরিয়া আদায়ার্থে নামাজ পড়বে। -আল মুগনী ২/২৯৪

বৃষ্টি হতে দেখলে পড়বে اللهم صَيِّبًا نافعا –সহীহ্ বুখারী ১০৩২

১১. দুআ‘র সময় ইমাম মুক্তাদী সকলেই কেবলাদিকে হয়ে দুআ‘ করবে। ইমাম মুসল্লিদের দিকে ফিরেও দুআ‘ করতে পারবে। তবে সকলেই কেবলা দিকে হওয়া মুস্তাহাব। (মাআরিফুস সুনান ৪/৫০৩)

তাছাড়া হাদীসে ইমাম কেবলা দিকে হওয়ার কথাই রয়েছে। আবার দাড়িয়েও দুআ‘ করতে পারবে। তবে মুক্তাদীগণ বসে থাকবে (বাযলুল মাজহুদ ৫/২৭২)। -সহীহ্ বুখারী, ১০২৪, ১০২৫, ১০২৮

১২. চতুষ্পদ জন্তুও সাথে করে মাঠে আসবে। কারণ, হাদীসে আছে, চতুষ্পদ জন্তুর কারণেই জমিনে বৃষ্টি হয়। -ইবনে মাজাহ ৪০১৯

১৩. উলামায়ে কেরাম বৃষ্টির নামাজের পূর্বে তিনটি রোযা রাখার কথাও বলেন। -রদ্দুল মুহতার ৩/৭২ (যাকারিয়া)

১৪. সালাতুল ইসতিসকার দোয়া। অর্থাৎ, দুআ‘র মধ্যে বিশেষ করে এই দুআটি পড়বে-

 اللَّهُمَّ اسْقِنَا غَيْثًا مُغِيثًا مَرِيئًا نَافِعًا غَيْرَ ضَارٍّ عَاجِلاً غَيْرَ آجِلٍ ‏”‏

হে আল্লাহ! আমাদেরকে বিলম্বে নয় বরং তাড়াতাড়ি ক্ষতিমুক্ত-কল্যাণময়, তৃপ্তিদায়ক, সজীবতা দানকারী, মুষল ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করো। -সুনানে আবু দাউদ ১১৬৯

১৫. ইমামের জন্য মিম্বরের ব্যবস্থা করা না করা নিয়ে উভয় রকমের হাদীস রয়েছে। -বাযলুল মাজহুদ ৫/২৮০ (হাদীস ১১৭৩)। তাই যে কোনটিই আমল করা যায়।

আহলে সালাফ মিডিয়া সার্ভিসের সাথে থাকার জন্য জাযাকুমুল্লাহ্

Check Also

রোযা ও তারাবীর মাসায়েল

রোযা ও তারাবীর মাসায়েল জানা আমাদের সবার জন্যই জরুরী।  যাতে করে আমাদের সকলের রোযাগুলো সহীহ্ …

আপনি কিভাবে তালাক দিবেন?

আপনি কিভাবে তালাক দিবেন? প্রবন্ধটি তালাকের ক্ষেত্রে একটি সহজ সরল উপস্থাপন। এতে একজন স্বামী তার …

One comment

  1. Awesome! Its genuinely remarkable post, I have got much clear idea regarding from this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!