হোম / জরুরী মাসায়েল / মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়ার বিধান

মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়ার বিধান

মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়ার বিধান সম্পর্কে অনেকেই আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন। তাই আপনাদের জন্য আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়ার বিধান

মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়ার বিষয়টি বর্তমানে মহামারির মত ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দিন যত গড়াচ্ছে মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়ার বিষয়টি প্রকট আকার ধারণ করছে। অবস্থাভেদে মনে হচ্ছে, মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেয়াই মনে হয় সুন্নাহ্।

এটি একটি মনগড়া দাবী ও তার জবাব

যারা আরবী ব্যতীত মাতৃভাষায় জুমার খুতবা দেওয়া জায়েয মনে করেন, তাদের অন্যতম দলিল হলো, তাদের ধারণা, ‘খুতবা’ হলো ওয়াজ বা বয়ান। অতএব, তা এমন ভাষায় হওয়া উচিত যেন শ্রোতারা তা বুঝতে পারে। অন্যথায় শ্রোতারা যদি নাই বুঝে, তাহলে তো খুতবা পড়ার দ্বারা কোন ফায়দা হচ্ছে না? নিচে আমরা তাদের আপত্তির কয়েকটি উত্তর প্রদান করছি :

জবাব ১ : খুতবা হলো যিকির বা বিশেষ ইবাদত, নিছক ওয়াজ-নসিহত বা বয়ান-বক্তৃতা নয়

জুমার খুতবা এটি নিছক ওয়াজ-নসিহত, বা বক্তৃতা-ভাষণ নয়। বরং কুরআন-হাদীসে খুতবাকে যিকির বা বিশেষ ধরণের ইবাদত বলা হয়েছে। যা জুমার নামাযের পূর্বেই আদায় করতে হয়। আরো লক্ষণীয় হচ্ছে, খুতবা দুটি দিতে হয়। এতে কম-বেশি করা যায় না। সাথে সাথে খুতবা দাঁড়িয়ে দিতে হয় এবং খুতবা পাঠকারী পুরুষ হতে হয়, ইত্যাদি।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ

অর্থ: হে ঈমানদারগণ! জুমুআ‘র দিনে যখন সালাতের জন্য ডাকা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং কেনা-বেচা ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য সর্বোত্তম, যদি তোমরা জানতে। (সূরা জুমুআ‘- ৯)

এই আয়াতের মধ্যে “যিকরুল্লাহ” দ্বারা প্রায় সকল মুফাসসিরিনদের মতেই খুতবা উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে নিম্নে কয়েকটি তাফসীরের উদ্ধৃতি পেশ করা হলো :

১। তাফসীরে রুহুল মাআনী, খ- ১৩, পৃষ্ঠা ৭০২-এ উল্লেখ আছে,

والمراد بذكر الله الخطبة الصلاة

অর্থ: আল্লাহর যিকর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, খুতবা ও নামায।

২। ইমাম রাযী (রহ.) আত-তাফসীরুল কাবীর গ্রন্থে লেখেন, (খ- ৯, পৃষ্ঠা ৩০)

الذكر هو الخطبة عند الأكثر من اهل التفسير

অর্থ : অধিকাংশ মুফাসসিরগণের নিকট যিকর দ্বারা খুতবা উদ্দেশ্য।

৩। আহকামুল কোরআন খ-৩, পৃষ্ঠা ৫৯৬-এ বর্ণিত আছে,

ويدل على ان المراد بالذكر ههنا الخطبة، ان الخطبة هى اللتى تلى النداء، وقد امر بالسعى اليه

অর্থ : যিকর থেকে যে খুতবাই উদ্দেশ্য, তার প্রমাণ আল্লাহ তা’আলা বলেন, আযান হলে যিকিরের দিকে আসো। আর আযানের সাথে সাথে খুতবাই প্রদান করা হয়।

৪। তাফসীরে ইবনে কাসীরে খ- ৯, পৃষ্ঠা ৪৫৬-এ উল্লেখ আছে,

فان المراد من ذكر الله الخطبة

অর্থ : আল্লাহর যিকর দ্বারা খুতবাই উদ্দেশ্য।

হাদীস শরীফেও খুতবাকে ‘যিকর’ বলা হয়েছে।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ اغْتَسَلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ غُسْلَ الْجَنَابَةِ ثُمَّ رَاحَ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَدَنَةً وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّانِيَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَقَرَةً وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الثَّالِثَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ كَبْشًا أَقْرَنَ وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الرَّابِعَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ دَجَاجَةً وَمَنْ رَاحَ فِي السَّاعَةِ الْخَامِسَةِ فَكَأَنَّمَا قَرَّبَ بَيْضَةً فَإِذَا خَرَجَ الْإِمَامُ حَضَرَتْ الْمَلَائِكَةُ يَسْتَمِعُونَ الذِّكْرَ.

অর্থ: হযরত আবূ হুরাইরাহ্ রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন জানাবাত গোসল (তথা ফরজ গোসলের) ন্যায় গোসল করে এবং সবার আগে জুমআর সালাতের জন্য আগমন করে সে যেন একটি উট কুরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করল, সে যেন একটি গাভী কুরবানী করল। তৃতীয় পর্যায়ে যে আগমন করল সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করল।

চতুর্থ পর্যায়ে যে আগমন করল সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। পঞ্চম পর্যায়ে যে আগমন করল সে যেন একটি ডিম সদকা করার নেকী পেল। পরে ইমাম যখন খুতবা দেয়ার জন্য বের হন তখন ফেরেশতাগণ উপস্থিত হন এবং যিকির তথা খুতবা শুনতে থাকেন। -সহীহ্ বুখারী ৮৮১; সহীহ্ মুসলিম ৮৫০।

অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم‏ “‏إِذَا كَانَ يَوْمُ الْجُمُعَةِ، وَقَفَتِ الْمَلاَئِكَةُ عَلَى باب الْمَسْجِدِ يَكْتُبُونَ الأَوَّلَ فَالأَوَّلَ، وَمَثَلُ الْمُهَجِّرِ كَمَثَلِ الَّذِي يُهْدِي بَدَنَةً، ثُمَّ كَالَّذِي يُهْدِي بَقَرَةً، ثُمَّ كَبْشًا، ثُمَّ دَجَاجَةً، ثُمَّ بَيْضَةً، فَإِذَا خَرَجَ الإِمَامُ طَوَوْا صُحُفَهُمْ، وَيَسْتَمِعُونَ الذِّكْرَ ‏”‏‏.‏

অর্থ: হযরত আবূ হুরাইরাহ্ রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জুমুআ‘র দিন মসজিদের দরজায় ফেরেশতারা অবস্থান করেন এবং ক্রমানুসারে পূর্বে আগমণকারীদের নাম লিখতে থাকেন। যে সবার পূর্বে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি মোটাতাজা উট কুরবানী করে। অতঃপর যে আসে সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি গাভী কুরবানী করে।

অতঃপর মেষ কুরবানী করার ন্যায়। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি মুরগী সদকাকারীর ন্যায়। অতঃপর আগমনকারী ব্যক্তি একটি ডিম দানকারীর ন্যায়। অতঃপর ইমাম যখন খুতবার জন্য বের হন তখন ফেরেশতারা তাদের খাতা বন্ধ করে মনোযোগ সহকারে খুতবা শ্রবণ করতে থাকে। -সহীহ্ বুখারী ৯২৯; মুসনাদে আহমদ ১০৫৬৭; নাসায়ী ১৩৮০; সুনানে ইবনে মাজাহ্ ১০৯২

আর জিকির রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ভাষায় করেছেন, সে ভাষায় করতে হয়। উদাহরণস্বরুপ সহিহ হাদিসে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলার অনেক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে৷ এখন কেউ সারা দিন যিকির করল বাংলাতে আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। তাহলে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলার যে ফজিলত রয়েছে, তা সে পাবে না।

কারণ জিকির করতে হবে আরবিতে। এজন্য আজানও আরবিতে দিতে হয়। যদিও আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ আজানের অর্থ বুঝে না। কারণ, আজান হল জিকির। আর জিকির কখনও মাতৃভাষায় হয় না৷ খুতবা মুসল্লি না বুঝার কারণে যদি বাংলা ভাষায় দিতে হয়, তাহলে আজানও বাংলা ভাষায় দিন। কারণ আজানের অর্থ ও মানুষ বুঝে না। এজন্য উম্মতের বরেণ্য হাদীস বিশারদ যারা, তাদের বক্তব্য হল, সর্বযুগে সব জায়গায় জুমআর খুতবা আরবি ভাষায় দেওয়া হয়েছে।

জুমার খুতবা এক বিশেষ ধরণের ইবাদত

জুমার খুতবা বিশেষ ধরণের ইবাদত হওয়ার কারণেই জুমার খুতবা প্রদানের বিশেষ নিয়ম রয়েছে। আর তাহলো, দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়া, দুই খুতবার মাঝখানে বসা ইত্যাদী। জুমার খুতবা যদি নিছক ভাষণ-বক্তৃতা হতো, তাহলে এসব বিষয়ের দরকার ছিল না। কারণ, ভাষণ-বক্তৃতা বসেও দেওয়া যায়।

عن جابر بن سمرة قال : أن رسول الله صلى الله عليه و سلم كان يخطب قائما ثم يجلس ثم يقوم فيخطب قائما فمن نبأك أنه كان يخطب جالسا فقد كذب فقد والله صليت معه أكثر من ألفي صلاة. مسلم: 862

হযরত জাবের বিন সামুরা রা. বলেন, নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। অতপর বসে পুনরায় দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। সুতরাং যে তোমাকে সংবাদ দিবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে খুতবা দিতেন, সে মিথ্যা বলল। আল্লাহর কসম আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দুই হাজারের অধিকবার নামায পড়েছি। -মুসলিম ৮৬২

অতএব উল্লিখিত আয়াত ও হাদীস থেকে বুঝা গেল, মৌলিকভাবে খুতবা হলো যিকির বা বিশেষ ইবাদত। নিছক ওয়াজ-নসিহত বা বয়ান-বক্তৃতা নয়। আর যিকির কিংবা ইবাদত এর ক্ষেত্রে যার মধ্যে ন্যূণতম বিবেক-বুদ্ধি রয়েছে তাদের কেউই মাতৃভাষায় যিকির বা ইবাদত করার কথা বলবেন না।

জবাব ২ : জুমার খুতবা দুই রাকাত নামাযের স্থলাভিষিক্ত

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ : إِنَّمَا جُعِلَتِ الْخُطْبَةُ مَكَانَ الرَّكْعَتَيْنِ، فَإِنْ لَمْ يُدْرِكَ الْخُطْبَةَ فَلْيُصَلِّ أَرْبَعًا. المصنف لابن أبي شيبة: 5367

হযরত উমর রা. বলেন, জুমার খুতবা দুই রাকাত নামাজের স্থলাভিষিক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি খুতবা পেল না সে চার রাকাত পড়বে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৫৩৬৭

হযরত আতা, তাউস, মুজাহিদ, মাকহুল প্রমুখ ইমাম থেকেও এরুপ বক্তব্য রয়েছে। দেখুন, মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৫৩৬৮-৫৩৭৩।

عَنْ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ قَالَ : كَانَتِ الْجُمُعَةُ أَرْبَعًا، فَجُعِلَتْ رَكْعَتَيْنِ مِنْ أَجْلِ الْخُطْبَةِ، فَمَنْ فَاتَتْهُ الْخُطْبَةُ فَلْيُصَلِّ أَرْبَعًا. المصنف لابن أبي شيبة: 5374

হযরত উমর রা. বলেন, জুমার নামাজ চার রাকাত ছিল, খুতবার কারণে দুই রাকাত করা হয়েছে। সুতরাং যার খুতবা ছুটে যাবে, সে চার রাকাত পড়বে। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৫৩৭৪

عن عبد الله بن مسعود قال : من أدرك الخطبة فالجمعة ركعتان ومن لم يدركها ليصل أربعا ومن لم يدرك الركعة فلا يعتد بالسجدة حتى يدرك الركعة. مجمع الزوائد 2/194 (3164) قال الهيثمي: رواه الطبراني في الكبير، ورجاله ثقات

আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, যে জুমার খুতবা পায় সে দুই রাকাত, আর যে না পায় সে চার রাকাত নামায পড়বে। …….. মাজমাউয যাওয়ায়েদ ২/১৯৪ (৩১৬৪)লক্ষণীয় যে, খুতবা ছুটে গেলে জুমার নামাজ চার রাকাত পড়তে বলা হচ্ছে। এতেও সহজেই অনুমেয় যে, খুতবা কোন ভাষণ বক্তৃতা নয়, বরং তা নামাজের মতই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।

নামাযের কিছু মাসআলা জুমার খুতবাতে কার্যকর হয়

নামাযের অনেক মাসআলা জুমার খুতবাতে কার্যকর হয়। যেমন: নামাযে চুপ থাকা ওয়াজিব, তদ্রুপ জুমার খুতবাতেও চুপ থাকা ওয়াজিব। এ কারণেই তো খুতবার সময় কোন ব্যক্তি কথা বলল, অন্য কেউ তাকে বলল, চুপ করো। এমন বলায় খুতবা শুনতে কোন সমস্যা হয় না, তবুও তা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এমনকি খুতবা চলাকালে দরুদ শরীফও পড়তে পারবে না।

سَعِيدُ بْنُ الْمُسَيَّبِ أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ أَنْصِتْ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ لَغَوْتَ.

আবূ হুরাইরাহ্ (রাযি.) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জুমার দিন যখন তোমার পাশের মুসল্লীকে চুপ থাক বলবে, অথচ ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তা হলে তুমি একটি অনর্থক কথা বললে। -সহীহ বুখারী ৯৩৪

عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَرَأَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ تَبَارَكَ وَهُوَ قَائِمٌ فَذَكَّرَنَا بِأَيَّامِ اللَّهِ وَأَبُو الدَّرْدَاءِ أَوْ أَبُو ذَرٍّ يَغْمِزُنِي فَقَالَ مَتَى أُنْزِلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ إِنِّي لَمْ أَسْمَعْهَا إِلاَّ الآنَ ‏.‏ فَأَشَارَ إِلَيْهِ أَنِ اسْكُتْ فَلَمَّا انْصَرَفُوا قَالَ سَأَلْتُكَ مَتَى أُنْزِلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ فَلَمْ تُخْبِرْنِي فَقَالَ أُبَىٌّ لَيْسَ لَكَ مِنْ صَلاَتِكَ الْيَوْمَ إِلاَّ مَا لَغَوْتَ ‏.‏ فَذَهَبَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ وَأَخْبَرَهُ بِالَّذِي قَالَ أُبَىٌّ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ “‏ صَدَقَ أُبَىٌّ ‏”‏ ‏.

উবাই ইবনু কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমুআহর সালাত (নামায/নামাজ) এ (খুতবাহ দিতে) দাঁড়িয়ে সূরাহ তাবারাকা (মুলক) পাঠ করেন এবং আমাদের উদ্দেশে আল্লাহ্‌র দিনসমূহের ইতিহাস বর্ণনা করেন। আবূ দারদা অথবা আবূ যার (রাঃ) আমাকে খোঁচা মেরে বলেন, সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে? আমি তো তা এখনই শুনলাম। তিনি তার দিকে ইশারা করে বলেন, চুপ করুন।

সাহাবীরা চলে গেলে তিনি বলেন, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে, অথচ আপনি আমাকে তা অবহিত করেননি? উবাই(রাঃ) বলেন, আজকে আপনার সালাত (নামায/নামাজ) হয়নি, অনর্থক কাজই হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে বর্ণনা করেন এবং উবাই যা বলেছেন, তাঁকে তাও অবহিত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ উবাই ঠিকই বলেছে। -ইবনে মাজাহ ১১১১

এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, খুতবার সময় দ্বীনী বিষয়ও জিজ্ঞাসা করা নিষেধ। এক কথায় খুতবা চলাকালীন কোন ধরণের কথা বলা যায় না, যেমনটি নামাজের মধ্যে কোন রকমের কথা বলা যায় না। যেহেতু খুতবা নামাজের মতই একটি ইবাদত, আর নামাজে আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় কোরআন পড়া জায়েয নয়, তাই খুতবাও আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় প্রদান করা জায়েয হবে না।

জবাব ৩ : কুরআনের অনেক আয়াতে কুরআনুল কারীমকে ওয়াজ, নসীহত বা বয়ান বলা হয়েছে

সূরা বাকারা, আয়াত-২৭৫

فَمَنْ جَاءَهُ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّهِ فَانْتَهَى فَلَهُ مَا سَلَفَ وَأَمْرُهُ إِلَى اللَّهِ وَمَنْ عَادَ فَأُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

সূরা ইউনুস, আয়াত-৫৭

يَاأَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُمْ مَوْعِظَةٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى وَرَحْمَةٌ لِلْمُؤْمِنِينَ

সূরা ছদ, আয়াত-৮৭

إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ

সূরা কলম, আয়াত-৫১-৫২

وَإِنْ يَكَادُ الَّذِينَ كَفَرُوا لَيُزْلِقُونَكَ بِأَبْصَارِهِمْ لَمَّا سَمِعُوا الذِّكْرَ وَيَقُولُونَ إِنَّهُ لَمَجْنُونٌ   وَمَا هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ

সূরা তাকবীর, আয়াত-২৭

إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِلْعَالَمِينَ

সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১৩৮

هَذَا بَيَانٌ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِلْمُتَّقِينَ

পেছনে আমরা সহীহ্ বুখারীর ৮৮১ নং হাদীস উল্লেখ করেছি যে, জুমার খুতবাকে ‘যিকির’ বলা হয়েছে। আর এখন আমরা দেখলাম যে, স্বয়ং কুরআনকেও ‘যিকির’ বলা হয়েছে। এখন খুতবা যদি মাতৃভাষায় দেয়া যেতে পারে তাহলে খুতবার মতো কুরআনকেও নামাযের মধ্যে মাতৃভাষায় পাঠ করা জায়েয হতে হবে। কারণ, আরবী তেলাওয়াত শ্রোতারা অনেকেই বুঝে না। কিন্তু কোনো মুসলিম কি তা বৈধ বলতে পারে বা বলবে?

তেমনিভাবে আযানের মধ্যে حى على الصلاة না বলে ‘নামাযের দিকে আসো’ বলা উচিৎ। ফজরের আযানে الصلاة خير من النوم না বলে ‘নামায ঘুম হতে উত্তম’ বলা উচিৎ। কারণ, শ্রোতারা আরবী ভাষায় এ সমস্ত আহ্বান বুঝতে পারে না। অথচ এমন কথা কেউ বলে না। সুতরাং বুঝা গেল যে, খুতবাকে শুধুই ভাষণ-বক্তৃতা বলা একটি মনগড়া যুক্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। যা একেবারেই ভিত্তিহীন।

জবাব ৪ : কিছু সরল উপস্থাপনা

  • আরবি ছাড়া ভিন্ন ভাষায় খুতবা দেয়ার কোন রেওয়াজ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে ছিল না।
  • রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিনিধি দল এসেছে। তাদের মধ্যে ভিন্ন ভাষাভাষি সাহাবীও ছিলেন। কিন্তু কোন সময় নবীজী তাদের জন্য জুমার খুতবা ভিন্ন ভাষায় প্রদান করার জরুরত মনে করেননি।
  • খুলাফায়ে রাশিদ্বীন, সাহাবায় কেরাম তাবিয়ীন ও তবে-তাবিয়ীন এর যুগেও কোথাও আরবী ছাডা ভিন্ন ভাষায় খুতবা দেয়ার প্রচলন ছিল না। ফেক্বহের বিখ্যাত মুজতাহিদগণের যুগে বা ফেক্বাহ সঙ্কলনের যুগে খুতবা আরবী ছাড়া ভিন্ন ভাষায় দেয়া হতো না। এবং পরবর্তি হাদিস সঙ্কলনের যুগেও খুতবা আরবী ছাড়া ভিন্ন ভাষায় দেয়া হতো না।
  • দ্বীন শেখা ও শেখানোর লক্ষে আরবী ছাড়াও অনারবী ভাষা শেখার প্রতি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহিত করছেন। খুতবার বেলায় কোথাও এমন উৎসাহ দান পরিলক্ষিত হয় না। যদি জুমার খুতবা সকলের জন্য বোঝাই জরুরী হতো, তাহলে অবশ্যই তিনি তার জন্য অনারবী ভাষা শেখার প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন।
  • কোরআন ও হাদিসে খুতবাকে জিকির বলে পরিচয় দেয়া হয়েছে। -সূরা জুমা ৯; বুখারী ৮৮১। আর জিকির আরবীতেই হওয়া উচিত।
  • যদি খুতবা ভাষণেরই নাম হয়, যা মানুষকে বুঝানোর জন্য স্থানীয় ভাষায় দেয়া জরুরী হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হল, যদি এমন স্থান হয়, যেখানে একাধিক ভাষাভাষি মানুষ থাকে যেমন হজ্বের সময় মক্কাতুল মুকাররমা ও মদীনাতুল মুনাওয়ারায়। তখন ইমাম কয় ভাষায় খুতবা দিবেন?
  • জুমার খুতবা যোহরের সময় হওয়ার পূর্বে দিলে তা আদায় হবে না। খুতবা দ্বারা যদি যিকরুল্লাহ উদ্দেশ্য না হয়ে ওয়াজ বা নসিহত উদ্দেশ্য হতো, তাহলে যোহরের ওয়াক্তের নির্দিষ্টতার কী প্রয়োজন? এমনিভাবে কেউ যদি দ্বিপ্রহরের পূর্বে খুতবা পড়ে ফেলে আর দ্বিপ্রহরের পরে নামায আদায় করে, তাহলে কী শ্রোতাদের ওয়াজ বা নাসিহা হাসিল হবে না? কিন্তু সমস্ত ফুকাহায়ে কেরাম একমত যে, এমতাবস্থায় ব্যক্তির জুমা সহীহ হবে না।
  • একটি মসজিদে জুমু’আর দিন খুতবার সময় দশ জন ইংরেজি ভাষী, দশ জন উর্দূ ভাষী, দশ জন ফারসী ভাষী, দশ জন আরবী ভাষী ও দশ জন বাংলা ভাষী মুসল্লি উপস্থিত রয়েছেন। এমতাবস্থায় খতীব সাহেব শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে কোন ভাষায় খুতবা পেশ করবেন?
  • ওয়াজ নসিহত বসে বসে করলে হয়ে যায়। এমনকি রাসুল সা. নিজেই বেশিরভাগ সময় বসে বসে ওয়াজ নসিহত করছেন ও দ্বীনি তা’লীম দিয়েছেন। কিন্তু জুমার খুতবা বসে দেননি। এমনকি বসে দেয়াও যাবে না। তাহলে জুমার খুতবা ভাষণ হয় কি করে?
  • খুতবা মাতৃভাষায় হতে হবে মর্মে কোন সহীহ্ হাদীস নেই। এমনকি সাহাবা-তাবেঈন থেকেও নেই। তাহলে যেখানে খুতবা আরবীতে হওয়ার পক্ষে অসংখ্য দলীল রয়েছে, সেখানে শুধু মনগড়া যুক্তিতে কেন তা মাতৃভাষায় হতে হবে?
  • সাহাবীগণ তাঁদের শত বছরের ইতিহাসে কোনো দিন আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেননি। সাহাবীদের যুগে বহু অনারব দেশ বিজয় হয়ে মুসলমানদের কর্তৃত্বে এসেছিল, যেগুলোর অনেক স্থানেই ভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিল। তখন দ্বীনের তাবলীগ ও মাসলা-মাসায়েলের তালীম দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্থানীয় ভাষায় জুমু’আর খুতবা প্রদানের প্রয়োজন ছিল বেশি

কেননা, খুতবা ছাড়া মাসলা-মাসায়েল শিক্ষা-দীক্ষার জন্য কোনো কিতাবাদী রচিত হয়েছিল না। তখন বেশ কিছু সাহাবী ও তাবেয়ী অনারবী বিভিন্ন ভাষায় অত্যন্ত দক্ষও ছিলেন। তবুও তাঁরা আরবী ভাষাতেই খুতবা প্রদান করতেন।

এমনকি হযরত সালমান ফারসী (রা.) তাঁর মাতৃভাষা ফারসী হওয়া সত্ত্বেও পারস্যের এক যুদ্ধে সেনাপতি থাকাকালে সেখানকার ফারসী ভাষাভাষী লোকদের সাথে আরবীতে কথা বলেছেন। দোভাষী তার অনুবাদ করেছে। একপর্যায়ে দোভাষীর অনুবাদ যথার্থ না হওয়ার আশংকায় হযরত সালমান ফারসী (রা.) নিজেই কোরআন শরীফের একটি বাক্যের ফারসী অনুবাদ করেন । -তিরমিযী শরীফ, হাদীস-১৫৪৮

  • এমন মনে করা ঠিক নয় যে, রাসূল (সা.) ও সাহাবীদের যুগে অনারবী ভাষায় খুতবা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ যামানায় দলে দলে লোক ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন,

وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا

অর্থ : ‘আর আপনি দেখবেন লোকেরা দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে।’ (সূরা নাছর, আয়াত-২)

উক্ত আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পেছনে বিভিন্ন ভাষার মানুষ নামায আদায় করত। খুতবা ছাড়া দ্বীনি শিক্ষার অন্য কোনো মাধ্যমও তেমন ছিল না। তারপরও রাসূলুল্লাহ (সা.) অন্য ভাষায় খুতবা অনুবাদের ব্যবস্থা করেননি। তদ্রুপ সাহাবীগণের যুগে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সম্পর্কে বুখারী শরীফ ১/১৩ তে বর্ণিত আছে, তিনি নিজের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য দোভাষী ব্যবহার করতেন। তবুও তিনি স্থানীয় ভাষায় খুতবা দেওয়া বা খুতবার অনুবাদের ব্যবস্থা করেননি।

জবাব ৫ : জুমার খুতবার শর্ত ও সুন্নত সমূহ

জুমার খুতবার কিছু সুন্নত ও শর্ত রয়েছে। যেগুলো থেকে স্পষ্টতই বুঝে আসে যে, বয়ান-বক্তৃতার সাথে জুমার খুতবার দূরতম কোন সম্পর্কও নেই। কারণ, ওয়াজ-নসীহত বা বয়ান-বক্তৃতার জন্য কোন ভাবেই এগুলো শর্ত হতে পারে না। সুতরাং জুমার খুতবা যেহেতু নিছক বক্তৃতা নয় যে, তা মানুষের বুঝতে হবে, তাই তা আরবী ছাড়া অন্য কোন ভাষায় দেওয়ার অবকাশ থাকতে পারে না।

জুমার খুতবার আযানের সময় ইমাম সাহেব মিম্বরে বসা থাকা সুন্নাত

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلي الله عليه وسلم يَخْطُبُ خُطْبَتَيْنِ كَانَ يَجْلِسُ إِذَا صَعِدَ الْمِنْبَرَ حَتَّى يَفْرُغَ – أُرَاهُ قَالَ الْمُؤَذِّنُ – ثُمَّ يَقُومُ فَيَخْطُبُ ثُمَّ يَجْلِسُ فَلَا يَتَكَلَّمُ ثُمَّ يَقُومُ فَيَخْطُبُ ‏.‏

ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমাতে দু’টি খুতবা প্রদান করতেন। প্রথমে তিনি মিম্বারে উঠে মুয়াযযিন আযান শেষ না করা পর্যন্ত বসে থাকতেন, অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে (প্রথম) খুতবা দিতেন, তারপর বসতেন এবং কোন কথা না বলে আবার দাঁড়াতেন এবং (দ্বিতীয়) খুতবা দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ১০৯২

عن ابن شهاب قال بلغنا أن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – كان يبدأ فيجلس على المنبر فإذا سكت المؤذن قام فخطب الخطبة الأولى ثم جلس شيئا يسيرا ثم قام فخطب الخطبة الثانية حتى إذا قضاها استغفر ثم نزل فصلى. قال ابن شهاب: فكان إذا قام أخذ عصا فتوكأ عليها وهو قائم على المنبر، ثم كان أبو بكر الصديق وعمر بن الخطاب وعثمان بن عفان يفعلون مثل ذلك. المراسيل لأبي داود: 55

তাবেয়ী হযরত ইবনে শিহাব রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার শুরুতে মিম্বরে বসতেন। যখন মুয়াজ্জিন আযান শেষে চুপ করত, তখন তিনি দাঁড়িয়ে প্রথম খুতবা দিতেন। অতপর সামান্য বসে পুনরায় দ্বিতীয় খুতবা দিতেন। এমনকি খুতবার শেষের দিকে ইস্তেগফার করতেন। তারপর মিম্বর থেকে নেমে নামায পড়তেন।

ইবনে শিহাব  রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাঁড়াতেন তখন লাঠিতে ধরে দাঁড়াতেন এবং লাঠিতে ভর করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এমনটিই হযরত আবু বকর, হযরত উমর এবং হযরত উসমান রাযিআল্লাহু আনহু করেছেন। -মারাসিলে আবু দাউদ ৫৫

জুমার খুতবাতে তাশাহহুদ পাঠ করা সুন্নাত

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ كُلُّ خُطْبَةٍ لَيْسَ فِيهَا تَشَهُّدٌ فَهِيَ كَالْيَدِ الْجَذْمَاءِ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ غَرِيبٌ ‏.‏

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে খুতবায় তাশাহহুদ পাঠ করা হয় না তা কাটা হাতের সমতুল্য। -তিরমিযী ১১০৬; আবু দাউদ ৪৮৪১

জুমার খুতবাতে কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করা সুন্নাত

عَنْ عَمْرَةَ بِنْتِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، عَنْ أُخْتٍ، لِعَمْرَةَ قَالَتْ أَخَذْتُ ‏(‏ق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ‏)‏ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَهُوَ يَقْرَأُ بِهَا عَلَى الْمِنْبَرِ فِي كُلِّ جُمُعَةٍ ‏.‏

আমর বিনত আবদুর রহমান (রাঃ) তার জনৈকা বোন থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি “কাফ ওয়াল কুরআনিল মজীদ” সূরাটি জুমু’আর দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখ থেকে শুনে মুখস্ত করেছি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক জুমুআয় এ সূরাটি মিম্বরে থেকে পাঠ করতেন।  -মুসলিম ৮৭২

عَنْ عَبْدِ، اللَّهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ مَعْنٍ عَنْ بِنْتٍ لِحَارِثَةَ بْنِ النُّعْمَانِ، قَالَتْ مَا حَفِظْتُ ‏(‏ ق‏)‏ إِلاَّ مِنْ فِي رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَخْطُبُ بِهَا كُلَّ جُمُعَةٍ ‏.‏ قَالَتْ وَكَانَ تَنُّورُنَا وَتَنُّورُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَاحِدًا ‏.‏

হারিস ইবনু নুমান (রাঃ) এর জনৈকা কন্যা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি “কাফ” সূরাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুখ থেকে শুনে কণ্ঠস্থ করেছি। তিনি প্রতি শুক্রবার ঐ সূরাটি খুতবায় পাঠ করতেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চুলা ও আমাদের চুলা অভিন্ন ছিল। -মুসলিম ৮৭৩

عَنْ أُمِّ هِشَامٍ بِنْتِ حَارِثَةَ بْنِ النُّعْمَانِ، قَالَتْ لَقَدْ كَانَ تَنُّورُنَا وَتَنُّورُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَاحِدًا سَنَتَيْنِ أَوْ سَنَةً وَبَعْضَ سَنَةٍ وَمَا أَخَذْتُ ‏(‏ق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ‏)‏ إِلاَّ عَنْ لِسَانِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقْرَؤُهَا كُلَّ يَوْمِ جُمُعَةٍ عَلَى الْمِنْبَرِ إِذَا خَطَبَ النَّاسَ

উম্মে হিশাম বিনত হারিসা ইবনু নুমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চুলা দু-কিংবা দেড় বছর অভিন্ন ছিল। আমি “কাফ ওয়াল কুরআনিল মাজীদ” সূরাটি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুখ থেকে শুনে মুখস্ত করেছি। তিনি প্রতি ওক্রবার মিম্বরে থেকে লোকদের খুতবা প্রদানকালে এ সূরা পাঠ করতেন। -মুসলিম ৮৭৩

عَنْ عَمْرٍو، سَمِعَ عَطَاءً، يُخْبِرُ عَنْ صَفْوَانَ بْنِ، يَعْلَى عَنْ أَبِيهِ، أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقْرَأُ عَلَى الْمِنْبَرِ‏ وَنَادَوْا يَا مَالِكُ‏

সাফওয়ান ইবনু ইয়ালা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মিম্বরে উপর থেকে পড়তে শুনেছেন وَنَادَوْا يَا مَالِكُ “তারা চীৎকার করে বলবে, হে মালিক” (জাহান্নামের দারোগা), (সূরা যুখরূপঃ ৭৭)। -মুসলিম ৮৭১

عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَرَأَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ تَبَارَكَ وَهُوَ قَائِمٌ فَذَكَّرَنَا بِأَيَّامِ اللَّهِ

উবাই ইবনু কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার খুতবা দিতে দাঁড়িয়ে সূরা তাবারাকা (মুলক) পাঠ করেন এবং আমাদের উদ্দেশে আল্লাহর দিনসমূহের ইতিহাস বর্ণনা করেন। -ইবনে মাজাহ ১১১১

জুমার খুতবাতে মুসলমানদের জন্য উপদেশ থাকা সুন্নত

عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَرَأَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ تَبَارَكَ وَهُوَ قَائِمٌ فَذَكَّرَنَا بِأَيَّامِ اللَّهِ وَأَبُو الدَّرْدَاءِ أَوْ أَبُو ذَرٍّ يَغْمِزُنِي فَقَالَ مَتَى أُنْزِلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ إِنِّي لَمْ أَسْمَعْهَا إِلاَّ الآنَ ‏.‏ فَأَشَارَ إِلَيْهِ أَنِ اسْكُتْ فَلَمَّا انْصَرَفُوا قَالَ سَأَلْتُكَ مَتَى أُنْزِلَتْ هَذِهِ السُّورَةُ فَلَمْ تُخْبِرْنِي فَقَالَ أُبَىٌّ لَيْسَ لَكَ مِنْ صَلاَتِكَ الْيَوْمَ إِلاَّ مَا لَغَوْتَ ‏.‏ فَذَهَبَ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ فَذَكَرَ ذَلِكَ لَهُ وَأَخْبَرَهُ بِالَّذِي قَالَ أُبَىٌّ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ ‏ “‏ صَدَقَ أُبَىٌّ ‏”‏ ‏.

উবাই ইবনু কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমুআহর সালাত (নামায/নামাজ) এ (খুতবাহ দিতে) দাঁড়িয়ে সূরাহ তাবারাকা (মুলক) পাঠ করেন এবং আমাদের উদ্দেশে আল্লাহ্‌র দিনসমূহের ইতিহাস বর্ণনা করেন। আবূ দারদা অথবা আবূ যার (রাঃ) আমাকে খোঁচা মেরে বলেন, সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে? আমি তো তা এখনই শুনলাম। তিনি তার দিকে ইশারা করে বলেন, চুপ করুন।

সাহাবীরা চলে গেলে তিনি বলেন, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করলাম সূরাটি কখন নাযিল হয়েছে, অথচ আপনি আমাকে তা অবহিত করেননি? উবাই(রাঃ) বলেন, আজকে আপনার সালাত (নামায/নামাজ) হয়নি, অনর্থক কাজই হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তাঁকে বর্ণনা করেন এবং উবাই যা বলেছেন, তাঁকে তাও অবহিত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ উবাই ঠিকই বলেছে। -ইবনে মাজাহ ১১১১

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ السُّوَائِيِّ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَا يُطِيلُ الْمَوْعِظَةَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِنَّمَا هُنَّ كَلِمَاتٌ يَسِيرَاتٌ ‏.

জাবির ইবনু সামুরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিনে উপদেশ (ওয়াজ) দীর্ঘ করতেন না, বরং তা কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বাক্য হতো মাত্র। -আবু দাউদ ১১০৭

অথচ ভাষণ-বক্তৃতার মধ্যে নসীহত বা উপদেশ থাকা জরুরী নয়। নসীহত ছাড়াও বক্তৃতা, ভাষণ, বয়ান হয়ে থাকে।

জুমার খুতবা সংক্ষিপ্ত হওয়া সুন্নত

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ السُّوَائِيِّ قَالَ كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَا يُطِيلُ الْمَوْعِظَةَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِنَّمَا هُنَّ كَلِمَاتٌ يَسِيرَاتٌ ‏.

জাবির ইবনু সামুরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার দিনে উপদেশ দীর্ঘ করতেন না, বরং তা কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বাক্য হতো মাত্র। -আবু দাউদ ১১০৭

عن جابر بن سمرة قال كنت أصلي مع رسول الله صلى الله عليه و سلم فكانت صلاته قصدا وخطبته قصدا

হযরত জাবের ইবনে সামুরা রা. বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সালাত আদায় করেছি। তার নামায ছিল মাঝারি ধরনের এবং খুতবাও ছিল মাঝারি ধরনের (সংক্ষেপও নয়, দীর্ঘও নয়)। -মুসলিম ৮৬৬; তিরমিযী ৫০৭

عَنْ وَاصِلِ بْنِ حَيَّانَ قَالَ قَالَ أَبُو وَائِلٍ خَطَبَنَا عَمَّارٌ فَأَوْجَزَ وَأَبْلَغَ فَلَمَّا نَزَلَ قُلْنَا يَا أَبَا الْيَقْظَانِ لَقَدْ أَبْلَغْتَ وَأَوْجَزْتَ فَلَوْ كُنْتَ تَنَفَّسْتَ ‏.‏ فَقَالَ إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏إِنَّ طُولَ صَلاَةِ الرَّجُلِ وَقِصَرَ خُطْبَتِهِ مَئِنَّةٌ مِنْ فِقْهِهِ فَأَطِيلُوا الصَّلاَةَ وَاقْصُرُوا الْخُطْبَةَ وَإِنَّ مِنَ الْبَيَانِ سِحْرًا ‏”‏ ‏.‏

আবূ ওয়ায়িল (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আম্মার (রাযিঃ) আমাদের উদ্দেশে সংক্ষেপে একটি সারগর্ভ ভাষণ দিলেন। তিনি মিম্বার থেকে নামলে আমরা বললাম, হে আবূল ইয়াকযান। আপনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ ভাষণ দিয়েছেন, তবে যদি তা কিছুটা দীর্ঘ করতেন। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, কোন ব্যক্তির দীর্ঘ সালাত ও সংক্ষিপ্ত ভাষণ তার প্রজ্ঞার পরিচায়ক। অতএব, তোমরা সালাতকে দীর্ঘ এবং ভাষণকে সংক্ষিপ্ত কর। অবশ্যই কোন কোন ভাষণে যাদুকরি প্রভাব থাকে। -মুসলিম ৮৬৯

জুমার খুতবা দাঁড়িয়ে পাঠ করা সুন্নাত

عن جابر بن سمرة قال : أن رسول الله صلى الله عليه و سلم كان يخطب قائما ثم يجلس ثم يقوم فيخطب قائما فمن نبأك أنه كان يخطب جالسا فقد كذب فقد والله صليت معه أكثر من ألفي صلاة. مسلم: 862

হযরত জাবের বিন সামুরা রা. বলেন, নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। অতপর বসে পুনরায় দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। সুতরাং যে তোমাকে সংবাদ দিবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে খুতবা দিতেন, সে মিথ্যা বলল। আল্লাহর কসম আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দুই হাজারের অধিকবার নামায পড়েছি। -মুসলিম ৮৬২

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلي الله عليه وسلم يَخْطُبُ خُطْبَتَيْنِ كَانَ يَجْلِسُ إِذَا صَعِدَ الْمِنْبَرَ حَتَّى يَفْرُغَ – أُرَاهُ قَالَ الْمُؤَذِّنُ – ثُمَّ يَقُومُ فَيَخْطُبُ ثُمَّ يَجْلِسُ فَلَا يَتَكَلَّمُ ثُمَّ يَقُومُ فَيَخْطُبُ ‏.‏

ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমাতে দু’টি খুতবা প্রদান করতেন। প্রথমে তিনি মিম্বারে উঠে মুয়াযযিন আযান শেষ না করা পর্যন্ত বসে থাকতেন, অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে (প্রথম) খুতবা দিতেন, তারপর বসতেন এবং কোন কথা না বলে আবার দাঁড়াতেন এবং (দ্বিতীয়) খুতবা দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ১০৯২

عن ابن شهاب قال بلغنا أن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – كان يبدأ فيجلس على المنبر فإذا سكت المؤذن قام فخطب الخطبة الأولى ثم جلس شيئا يسيرا ثم قام فخطب الخطبة الثانية حتى إذا قضاها استغفر ثم نزل فصلى. قال ابن شهاب: فكان إذا قام أخذ عصا فتوكأ عليها وهو قائم على المنبر، ثم كان أبو بكر الصديق وعمر بن الخطاب وعثمان بن عفان يفعلون مثل ذلك. المراسيل لأبي داود: 55

তাবেয়ী হযরত ইবনে শিহাব রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার শুরুতে মিম্বরে বসতেন। যখন মুয়াজ্জিন আযান শেষে চুপ করত, তখন তিনি দাঁড়িয়ে প্রথম খুতবা দিতেন। অতপর সামান্য বসে পুনরায় দ্বিতীয় খুতবা দিতেন। এমনকি খুতবার শেষের দিকে ইস্তেগফার করতেন। তারপর মিম্বর থেকে নেমে নামায পড়তেন।

ইবনে শিহাব  রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাঁড়াতেন তখন লাঠিতে ধরে দাঁড়াতেন এবং লাঠিতে ভর করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এমনটিই হযরত আবু বকর, হযরত উমর এবং হযরত উসমান রাযিআল্লাহু আনহু করেছেন। -মারাসিলে আবু দাউদ ৫৫

عَنْ أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَرَأَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ تَبَارَكَ وَهُوَ قَائِمٌ فَذَكَّرَنَا بِأَيَّامِ اللَّهِ

উবাই ইবনু কাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমার খুতবা দিতে দাঁড়িয়ে সূরা তাবারাকা (মুলক) পাঠ করেন এবং আমাদের উদ্দেশে আল্লাহর দিনসমূহের ইতিহাস বর্ণনা করেন। -ইবনে মাজাহ ১১১১

شُعَيْبُ بْنُ رُزَيْقٍ الطَّائِفِيُّ، قَالَ جَلَسْتُ إِلَى رَجُلٍ لَهُ صُحْبَةٌ مِنْ رَسُولِ اللهِ صلي الله عليه وسلم يُقَالُ لَهُ الْحَكَمُ بْنُ حَزْنٍ الْكُلَفِيُّ فَأَنْشَأَ يُحَدِّثُنَا قَالَ وَفَدْتُ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلي الله عليه وسلم سَابِعَ سَبْعَةٍ أَوْ تَاسِعَ تِسْعَةٍ فَدَخَلْنَا عَلَيْهِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ زُرْنَاكَ فَادْعُ اللهَ لَنَا بِخَيْرٍ فَأَمَرَ بِنَا أَوْ أَمَرَ لَنَا بِشَىْءٍ مِنَ التَّمْرِ وَالشَّأْنُ إِذْ ذَاكَ دُونٌ فَأَقَمْنَا بِهَا أَيَّامًا شَهِدْنَا فِيهَا الْجُمُعَةَ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلي الله عليه وسلم فَقَامَ مُتَوَكِّئًا عَلَى عَصًا أَوْ قَوْسٍ فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ كَلِمَاتٍ خَفِيفَاتٍ طَيِّبَاتٍ مُبَارَكَاتٍ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ لَنْ تُطِيقُوا أَوْ لَنْ تَفْعَلُوا كُلَّ مَا أُمِرْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ سَدِّدُوا وَأَبْشِرُوا”‏.

শু’আইব ইবনু রুযাইক্ব আত-ত্বায়িফী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক সাহাবীর নিকট বসা ছিলাম, যার নাম আল-হাকাম ইবনু হাযন আল-কুলাফী। তিনি আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আমি সাত বা আট সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের সপ্তম বা অষ্টমজন হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যাই এবং তাঁর সামনে উপস্থিত হয়ে বলি, হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনার সাক্ষাত পেয়েছি। আপনি মহান আল্লাহর নিকট আমাদের কল্যাণের জন্য দু’আ করুন। তখন তিনি কিছু খেজুর দ্বারা আমাদের মেহমানদারী করতে আদেশ করলেন।

সে সময় (মুসলিমদের) অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। আমরা বেশ কয়েকদিন (মদীনাতে) অবস্থান করলাম। এ সময় আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে জুমার সালাতও আদায় করেছি। জুমার খুতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি লাঠি অথবা ধনুকের উপর ভর দিয়ে পবিত্র ও বরকতপূর্ণ কথার দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং তাঁর কতক হালকা, উত্তম ও পবিত্র গুণাবলী বর্ণনা করেন।

অতঃপর বলেন, হে জনগণ! তোমাদেরকে যা কিছুর আদেশ দেয়া হয়েছে সে সবের প্রতিটি নির্দেশই তোমরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে সক্ষম হবে না। কাজেই তোমরা নিজেদের ’আমলের উপর অটল থাকো এবং সুসংবাদ প্রদান করো। -আবু দাউদ ১০৯৬

জুমার দুই খুতবার মাঝে বসা সুন্নাত

عن جابر بن سمرة قال : أن رسول الله صلى الله عليه و سلم كان يخطب قائما ثم يجلس ثم يقوم فيخطب قائما فمن نبأك أنه كان يخطب جالسا فقد كذب فقد والله صليت معه أكثر من ألفي صلاة. مسلم: 862

হযরত জাবের বিন সামুরা রা. বলেন, নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। অতপর বসে পুনরায় দাড়িয়ে খুতবা দিতেন। সুতরাং যে তোমাকে সংবাদ দিবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে খুতবা দিতেন, সে মিথ্যা বলল। আল্লাহর কসম আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দুই হাজারের অধিকবার নামায পড়েছি। -মুসলিম ৮৬২

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ كَانَ النَّبِيُّ صلي الله عليه وسلم يَخْطُبُ خُطْبَتَيْنِ كَانَ يَجْلِسُ إِذَا صَعِدَ الْمِنْبَرَ حَتَّى يَفْرُغَ – أُرَاهُ قَالَ الْمُؤَذِّنُ – ثُمَّ يَقُومُ فَيَخْطُبُ ثُمَّ يَجْلِسُ فَلَا يَتَكَلَّمُ ثُمَّ يَقُومُ فَيَخْطُبُ ‏.‏

ইবনু ’উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুমাতে দু’টি খুতবা প্রদান করতেন। প্রথমে তিনি মিম্বারে উঠে মুয়াযযিন আযান শেষ না করা পর্যন্ত বসে থাকতেন, অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে (প্রথম) খুতবা দিতেন, তারপর বসতেন এবং কোন কথা না বলে আবার দাঁড়াতেন এবং (দ্বিতীয়) খুতবা দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ১০৯২

عن ابن شهاب قال بلغنا أن رسول الله – صلى الله عليه وسلم – كان يبدأ فيجلس على المنبر فإذا سكت المؤذن قام فخطب الخطبة الأولى ثم جلس شيئا يسيرا ثم قام فخطب الخطبة الثانية حتى إذا قضاها استغفر ثم نزل فصلى. قال ابن شهاب: فكان إذا قام أخذ عصا فتوكأ عليها وهو قائم على المنبر، ثم كان أبو بكر الصديق وعمر بن الخطاب وعثمان بن عفان يفعلون مثل ذلك. المراسيل لأبي داود: 55

তাবেয়ী হযরত ইবনে শিহাব রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবার শুরুতে মিম্বরে বসতেন। যখন মুয়াজ্জিন আযান শেষে চুপ করত, তখন তিনি দাঁড়িয়ে প্রথম খুতবা দিতেন। অতপর সামান্য বসে পুনরায় দ্বিতীয় খুতবা দিতেন। এমনকি খুতবার শেষের দিকে ইস্তেগফার করতেন। তারপর মিম্বর থেকে নেমে নামায পড়তেন।

ইবনে শিহাব  রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন দাঁড়াতেন তখন লাঠিতে ধরে দাঁড়াতেন এবং লাঠিতে ভর করে মিম্বরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এমনটিই হযরত আবু বকর, হযরত উমর এবং হযরত উসমান রাযিআল্লাহু আনহু করেছেন। -মারাসিলে আবু দাউদ ৫৫

নবীজী আরবী ভাষায় নয় বরং মাতৃভাষায় খুতবা দিয়েছেন?

এমন উদ্ভট যুক্তিও অনেকে দিয়ে থাকেন যে, নবীজী আরবী ভাষায় নয় বরং মাতৃভাষায় খুতবা দিয়েছেন। আমরা বলি, তাহলে কি এটাও বলবেন যে, নবীজী আরবী ভাষায় নয় বরং মাতৃভাষায় কুরআন পড়েছেন, মাতৃভাষায় আজান দিয়েছেন। মাতৃভাষায় ইকামত দিয়েছেন। তাহলে তো কুরআন তিলাওয়াত এবং নামাযের সূরা-কেরাত, আজান ও ইকামত সবই মাতৃভাষায় দিতে হবে। আরবীতে কেন দেয়া হয়? বুঝা গেল এটি একটি অহতেুক কথা ছাড়া কিছুই নয়।

আরবী খুতবার আগে বাংলায় খুতবা প্রদান কেন বিদআত নয়?

“আরবী খুতবার আগে বাংলায় খুতবা প্রদান” এ বাক্যটি ভুল। কারণ, আমাদের মসজিদগুলোতে বাংলায় খুতবা দেয়া হয় না, বরং বাংলায় ওয়াজ-নসিহত করা হয়। খুতবা তো আরবীতেই দিতে হয়। দুই কারণে আমাদের মসজিদগুলোতে তা করা হয়। যথা-

১. জুমার নামাযের নির্ধারিত সময় হবার এক দেড় ঘন্টা আগে মুসল্লিরা মসজিদে এসে একত্র হন। তখন অনেকেই অহেতুক গল্প গুজবে লিপ্ত হয়, সেই কারণে খতীব সাহেব উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে কুরআন ও হাদীস থেকে কিছু আলোচনা করেন।

যে মুসল্লিরা তা শ্রবণ করেন, তারাও জানেন যে, এটা জুমার খুতবা নয়। তেমনি যিনি বয়ান করেন তথা খতীব সাহেব, তিনি নিজেও জানেন, এটা জুমার খুতবা নয়। এটি কেবলই মানুষ নামাযের নির্ধারিত সময়ের আগে একত্রিত হওয়ায় সময়টি কাজে লাগানোর একটি প্রচেষ্টা মাত্র। সুতরাং এটিকে খুতবা ধরে বিদআত বলার কোন সুযোগ নেই।

২. জুমার মূল খুতবার আগে বয়ান করা হযরত সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম থেকে প্রমাণিত।

عَاصِمُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ زَيْدٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: كَانَ أَبُو هُرَيْرَةَ يَقُومُ يَوْمَ الْجُمُعَةِ إِلَى جَانِبِ الْمِنْبَرِ فَيَطْرَحُ أَعْقَابَ نَعْلَيْهِ فِي ذِرَاعَيْهِ ثُمَّ يَقْبِضُ عَلَى رُمَّانَةِ الْمِنْبَرِ، يَقُولُ: قَالَ أَبُو الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ مُحَمَّدٌ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَالَ الصَّادِقُ الْمَصْدُوقُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، ثُمَّ يَقُولُ فِي بَعْضِ ذَلِكَ: وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ فَإِذَا سَمِعَ حَرَكَةَ بَابِ الْمَقْصُورَةِ بِخُرُوجِ الْإِمَامِ جَلَسَ. هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ

আসেম রহঃ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, জুমার দিন হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু  জুতা খুলে মিম্বরের পাশে দাঁড়িয়ে মিম্বর ধরে বলতেন, হযরত আবুল কাসেম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাদিকে মাসদুক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ধ্বংস আরবদের জন্য, ওই ফিতনার কারণে যা নিকটবর্তী। এরপর যখন ইমাম সাহেবের বের হবার আওয়াজ শুনতেন, তখন তিনি বসে যেতেন। -মুসতাদরাকে হাকমে ১/১৯০, হাদীস ৩৬৭

সুতরাং বুঝা গেল, আমাদের মসজিদগুলোর আমলটি বিদআত হবার প্রশ্নই উঠে না।

‘জুমার খুতবা আরবীতে দেয়া সুন্নাতবিষয়ক মতটি কি শুধু হানাফী মাযহাবের মত?

এখন হয়তো অনেকে বলতে পারেন, শুধুমাত্র হানাফী মাযহাবের মতেই আরবী ভাষায় খুতবা দেওয়া সুন্নত। আরবী ব্যতীত অন্য ভাষায় খুতবা দেওয়া বিদআত। কিন্তু এ কথা সম্পূর্ণ ভুল, বরং বাস্তবতা হলো, এ ব্যপারে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি ব্যতীত অন্য তিন ইমামের মত আরো কঠিন।

শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী মাযহাবের আইম্মায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ মত হলো, আরবী ভাষা ব্যতীত অন্য ভাষায় খুতবা পড়া জায়েযই নেই। যদি আরবী ভাষায় সক্ষম হওয়া সত্বেও অন্য ভাষায় খুতবা প্রদান করে, তাহলে তা আদায় হবে না।

كونها بالعربية تعبدا . للاتباع، والمراد أن تكون أركانها بالعربية؛ ولأنها ذكر مفروض فاشترط فيه ذلك كتكبيرة الإحرام، ولو كان الجماعة عجما لا يعرفون العربية . وهذا ما ذهب إليه الجمهور .

وقال أبو حنيفة وهو المعتمد عند الحنفية : تصح بغير العربية، ولو كان الخطيب عارفا بالعربية، ووافق الصاحبان الجمهور في اشتراط كونها بالعربية إلا للعاجز عنها . -الموسوعة الفقهية الكويتية 19/180

মালেকি মাযহাবের মত হলো, যদি জামাতের মধ্যে কেউই আরবী খুতবা প্রদানে সক্ষম না হয়, তাহলে তাদের জুমা রহিত হয়ে যায়। তখন তারা যোহরের নামাজ আদায় করবে। আর হাম্বলী ও শাফেয়ী মাযহাবে এতটুকুর সুযোগ আছে যে, যদি জামাতের কেউ আরবী খুতবা দিতে সক্ষম না হয় এবং এ পরিমাণ সময়ও নেই যে, খুতবা শিখতে পারবে এমতাবস্থায় অন্য ভাষায় খুতবা পাঠ করা জায়েয হবে এবং নামায আদায় সহীহ হবে। -ইনআমুল বারী ৪/১০৬-১০৭

এখানে আমরা সংক্ষেপে চার মাযহাবের অবস্থান তুলে ধরছি :

মালেকী মাযহাব

وذهب المالكية إلى أنه عند العجز عن الإتيان بها بالعربية لا تلزمهم الجمعة

অর্থ: আরবী ভাষায় জুমার খুতবা দিতে অক্ষম হলে তাদের উপর জুমার নামাজ পড়া আবশ্যক নয়। বরং যোহরের নামাজ পড়বে। -আল মাউসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ্ আল কুওয়াইতিয়্যাহ্ ১৯/১৮০

শাফেয়ী মাযহাব

(وَيُشْتَرَطُ كَوْنُهَا عَرَبِيَّةً) لِاتِّبَاعِ السَّلَفِ وَالْخَلَفِ وَلِأَنَّهَا ذِكْرٌ مَفْرُوضٌ فَاشْتُرِطَ فِيهِ ذَلِكَ كَتَكْبِيرَةِ الْإِحْرَامِ، فَإِنْ أَمْكَنَ تَعَلُّمُهَا خُوطِبَ بِهِ الْجَمِيعُ فَرْضَ كِفَايَةٍ وَإِنْ زَادُوا عَلَى الْأَرْبَعِينَ، فَإِنْ لَمْ يَفْعَلُوا عَصَوْا وَلَا جُمُعَةَ لَهُمْ بَلْ يُصَلُّونَ الظُّهْرَ .

অর্থাৎ, সালাফ এবং খালাফদের অনুসরণার্থে খুতবা আরবী ভাষায় হওয়া শর্ত। কেননা খুতবা নির্দিষ্ট যিকির তাই তাকবীরে তাহরীমার ন্যায় খুতবাও আরবী হওয়া শর্ত। যদি আরবী ভাষায় খুতবা দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তাদের জুমার নামাজ নেই। বরং যোহর পড়বে। -নিহায়াতুল মুহতাজ ৭/৮২ (শামেলা); আল মাউসুআতুল ফিক্বহিয়্যাহ্ আল কুওয়াইতিয়্যাহ্ ১৯/১৮০

হাম্বলী মাযহাব

ولا يصح الخطبة بغير العربية مع القدرة عليها بالعربية (كقراءة) فإنها لا تجزئ بغير العربية وتصح الخطبة بغير العربية (مع العجز) عنها بالعربية لأن المقصود بها الوعظ والتذكير وحمد الله والصلاة علي رسول الله صلي الله عليه وسلم.

অর্থ: আরবী ভাষায় সক্ষম হওয়া সত্বেও অন্য ভাষায় খুতবা প্রদান করা জায়েয নেই, যেমনি ভাবে নামাযে অন্য ভাষায় ক্বেরাত পড়া জায়েয নাই। তবে যদি আরবী ভাষায় অক্ষম হয়, তাহলে অন্য ভাষায় খুতবা প্রদান সহীহ হবে। কেননা খুতবা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআ‘লার প্রশংসা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ প্রেরণ, এবং নসিহত। -কাশফুল কিনা‘ ২/৩৬; ইনআমুল বারী, টীকা, ৪/১০৭

হানাফি মাযহাব

আরবী ব্যতীত অন্য ভাষায় খুতবা পড়া জায়েয নেই বরং মাকরূহে তাহরীমী। তবে যদি কোন ব্যাক্তি অন্য ভাষায় খুতবা দিয়ে দেয়, তাহলে জুমার শর্ত পূরণ হয়ে যাবে এবং নামাজও সহীহ হবে।

وصح شروعه مع كراهة التحريم بتسبيح وتهليل، كما صح لو شرع بغير عربية

-রদ্দুল মুহতার ১/৪৮৪

অতএব উল্লিখিত আলোচনা দ্বারা বুঝা গেলো ৪ মাযহাবের ইমামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, খুতবা আরবী ভাষায় হওয়া আবশ্যক। শ্রোতাদের বুঝে আসুক বা না আসুক।

আমাদের প্রতি একটি আপত্তি ও তার জবাব

ইমাম আবু হানীফা (রহ.) নামাযে ফারসী ভাষায় ক্বেরাত পাঠকে বৈধ বলেছেন। অতএব, আরবী ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা দেওয়াও বৈধ হবে।

জবাব নিম্নে উল্লেখ করা হলো :

১. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর উক্ত মতামত থেকে তিনি পরবর্তীতে রুজু (মত প্রত্যাহার) করেছেন। সুতরাং তার এই বর্জিত মতামতটি দলিল হিসেবে পেশ করা বোকার পরিচয় দেওয়া। যেমন হেদায়া কিতাবে ১/১০২ উল্লেখ আছে,

ويروى رجوعه فى اصل المسئلة إلى قولهما وعليه الاعتماد، والخطبة والتشهد على هذا الاختلاف

২. ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর প্রথম মতামত অনুযায়ী খুতবা অনারবী ভাষায় দেওয়া জায়েয দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল মাকরূহে তাহরীমির সাথে জায়েয। -শামী ২/১৮৩; বাহরুর রায়েক ১/৫৩৫; তাতারখানিয়া ২/৭৪; সিআয়া ২/১৫৫

এ ছাড়া ফিকহে হানাফীর অধিকাংশ কিতাবেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, আবু হানীফা (রহ.) এর মতে অনারবী ভাষায় খুতবা জায়েয দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মাকরূহে তাহরীমির সাথে জায়েয।

৩. ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর পূর্ববর্তী মতটির উদ্দেশ্য হলো, অনারবী ভাষায় খুতবা দ্বারা যদি আল্লাহর যিকর আদায় হয়ে যায়, তাহলে জুমা সহীহ হবে। কিন্তু খুতবার সুন্নত আরবী ভাষা পরিত্যাগ করার কারণে তা মাকরূহ হবে। যেমন খুতবা দাঁড়িয়ে পবিত্র অবস্থায়, শ্রোতাদের দিকে মুখ করে, পূর্ণ লেবাস পরিধান করে পাঠ করা সুন্নত। কেউ যদি ওযর-কারণ ছাড়া বসে বসে, কিবলামুখী হয়ে, শুধু সতর ঢেকে খুতবা দেয়, তা জায়েয, কিন্তু সুন্নত পরিপন্থী ও মাকরূহে তাহরীমি হবে।

অতএব, অনারবী ভাষায় খুতবা প্রদান করার ব্যাপারে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর পূর্বের মতটিকে দলিল হিসেবে পেশ করা কখনো সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

সারকথা

এতক্ষণের আলোচনা থেকে আমাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে গেলো যে, মাতৃভাষায় জুমুআ‘র খুতবা পদান করা একটি সুন্নাহ্ বহির্ভূত কাজ। যা থেকে আমাদের সকলেরই বিরত থাকতে হবে। হযরত ইরবাস বিন সারিয়া রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِي اخْتِلَافًا كَثِيرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ، وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ

অর্থ: তোমাদের মাঝে আমার পর যারা জীবিত থাকবে তারা অনেক মতভেদ দেখবে, তখন তোমাদের উপর আমার এবং আমার হেদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাত আঁকড়ে ধরা কর্তব্য। সেটিকে মাড়ির দাঁত দিয়ে কামরে রাখবে। আর সাবধান থাকবে নব উদ্ভাবিত ধর্মীয় বিষয় থেকে। কেননা ধর্ম বিষয়ে প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআ‘ত। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী।

-সুনানে তিরমিযী ২৬৭৬; সুনানে ইবনে মাজাহ ৪৪; সুনানে আবু দাঊদ ৪৬০৭; মুসনাদে আহমাদ ১৭১৪৪

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:  مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ

অর্থ: হযরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মে নেই এমন বিষয় ধর্মীয় বিষয় বলে আবিস্কার করে তা পরিত্যাজ্য। -সহীহ্ বুখারী ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম ১৭১৮

পরিশেষে আল্লাহ তাআ‘লার নিকট মিনতি তিনি যেন আমাদেরকে সর্বদায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহবায়ে কেরামের আদর্শের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করেন এবং এর বিপরীত যত আদর্শ ও চিন্তা-চেতনা রয়েছে তা থেকে হিফাজত করেন। আমীন।

-ইনআমুল বারী: ৪/১০৪-১০৯; দরসে তিরমিযী, ২/২৮১, ২৮২; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, ২/৫৬২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া, ১২/৩৪৯; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৬৪২; আহসানুল ফাতাওয়া, ৪/১৬০-১৬২; জাওয়াহিরুল ফিহক, ২/৫০০-৫২৫; ইমদাদুল মুফতীন, ২/৩২৮-৩৩০; আপ কে মাসায়িল আওর উনকা হল, ৪/১৩৩-১৩৫

আহলে সালাফ মিডিয়া সার্ভিসের সাথে থাকার জন্য অসংখ্য জাযাকাল্লাহ্

Check Also

রোযা ও তারাবীর মাসায়েল

রোযা ও তারাবীর মাসায়েল জানা আমাদের সবার জন্যই জরুরী।  যাতে করে আমাদের সকলের রোযাগুলো সহীহ্ …

আপনি কিভাবে তালাক দিবেন?

আপনি কিভাবে তালাক দিবেন? প্রবন্ধটি তালাকের ক্ষেত্রে একটি সহজ সরল উপস্থাপন। এতে একজন স্বামী তার …

২ comments

  1. ওয়াজ নসিহত কি আল্লাহর যিকির কি যিকির না বলুন ??

    • এর সমাধান আপনিই কুরআন-হাদীসের আলোকে পেশ করুন। তবে সাহাবা-তাবেঈন সেটা কেন অনুধাবন করলেন না? তারা কেন মাতৃভাষায় খুতবা দিলেন না?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!