হোম / আদব ও আখলাক / প্রিয় দ্বীনি ভাই! আদব ও আখলাকের প্রতি মনযোগী হোন!

প্রিয় দ্বীনি ভাই! আদব ও আখলাকের প্রতি মনযোগী হোন!

আমি হবো আদব ও আখলাকের উত্তম নমুনা।

প্রিয় দ্বীনি ভাই! আদব ও আখলাকের প্রতি মনোযোগী হোন! কারণ, আদব ও আখলাক মানুষের ভূষণ। যার আদব যত সুন্দর তার জীবন তত সুন্দর। আদব এটি মানবীয় গুণ। এমন নয় যে, আমার আদব শুধু উস্তাযের সাথে, মুরব্বিদের সাথে কিংবা মা-বাবার সাথে। বরং আমার আদব হবে প্রতিটি মানুষের সাথে, প্রতিটি মাখলুকের সাথে। কারণ, আদব বলাই হয় সমস্ত ভালো গুণ ও বৈশিষ্টের সমষ্টিকে। এই আদবেরই অপর নাম ‘মাকারিমুল আখলাক’ বা উত্তম চরিত্র। (ফাতহুল বারী, ১০/৪৪ কিতাবুল আদব)

আমাদেরকে এই আদব ও মাকরামিুল আখলাকেরই অধিকারী হতে হবে। কারণ সালাফের যুগে ইলম শিখার সাথে সাথে উস্তাযের কাছ থেকে আদবও গুরুত্বের সাথে শিখা হতো। ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর হাদীসের মজলিসে পাঁচ হাজারের চেয়েও বেশি ছাত্র জমা হতো, কিন্তু হাদীস লিখতো কেবল ৫০০ জন। আর বাকী সবাই আখলাক ও আদব শিখতেন। -সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১১/৩১৬

আদব এর অর্থ হল, তরীকা। কোনো কাজের ভালো তরীকাকে আদব বলা হয়। সব কাজ নিপুণভাবে করা আদব। এক হল কাজের আদব, আরেক হল সারা জীবনের আদব। এক হল কাজ নিপুণভাবে করা, আরেক হল সারা জীবন গুছিয়ে চলা। অন্তরে আদব সৃষ্টি করা। এবাদত, মুআমালা, মুআশারাসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী আদব রক্ষা করা।

শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ্ আবু গুদ্দাহ্ রহ. সম্পর্কে সায়্যেদ আহমদ সাকার বলেন,

لو قيل للأخلاق تجسدي لكانت عبد الفتاح

“আখলাককে যদি বলা হয় তুমি মূর্তপ্রতীক ধারণ কর, তাহলে তার চূড়ান্ত নমুনা হবেন শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ্”। -লিসানুল মিযান, ১/৫৮

ইলম শেখার আগেই মূলত ইলমের আদব শেখা উচিত। ইমাম ইবনে সিরীন রাহ. (১১০ হি.) বলেন-

كانوا يتعلمون الهدي كما يتعلمون العلم

‘তারা যেমন ইলম শিক্ষা করতেন তেমনি আচার-আচরণও শিক্ষা করতেন। (আলজামি লিআখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে, খতীব বাগদাদী ১/৭৯)

আল্লামা কারাফী রহ. বলেন, জেনে রেখো! অল্প আদব অনেক আমল থেকে উত্তম। এজন্যই রুওয়াইম তার ছেলেকে লক্ষ করে বলেছেন, বৎস! তোমার আমলকে লবণ বানাও আর আদবকে আটা বানাও। কারণ, অধিক আদবসম্পন্ন কম আমল, অল্প আদবসম্পন্ন বেশি আমল থেকে শ্রেয়। -মিন আদাবিল ইসলাম, ৯

স্বচ্চরিত্রের দ্বারা নেক আমলের পাল্লা ভারী হবে

হাদীস শরীফে এসেছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন,

عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَا مِنْ شَيْءٍ أَثْقَلُ فِي الْمِيزَانِ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ

অর্থ: হযরত আবূ দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দাঁড়িপাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে অধিক ভারী আর কিছুই নেই। -আবু দাউদ, ৪৭৯৯

অন্য হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي الدَّرْدَاءِ، قَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ ‏ “‏ مَا مِنْ شَيْءٍ يُوضَعُ فِي الْمِيزَانِ أَثْقَلُ مِنْ حُسْنِ الْخُلُقِ وَإِنَّ صَاحِبَ حُسْنِ الْخُلُقِ لَيَبْلُغُ بِهِ دَرَجَةَ صَاحِبِ الصَّوْمِ وَالصَّلاَةِ ‏”‏

আবুদ দারদা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ সচ্চরিত্র ও সদাচারই দাঁড়িপাল্লায় সবচাইতে ভারী হবে। সচ্চরিত্রবান ও সদাচারী ব্যক্তি তার সদাচার ও চরিত্র মাধুর্য দ্বারা অবশ্যই রোযাদার ও নামায়ীর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। -তিরমিযী, ২০০৩

অন্য আরেকটি হাদীসে এসছে,

أول ما يوضع في الميزان الخلق الحسن

দাঁড়িপাল্লায় সর্বপ্রথম উত্তম চরিত্র রাখা হবে। -আল জামিউস সগীর, ২৮২৩

হযরত জুনাঈদ বাগদাদী রহ. বলেন, চারটি গুণ মানুষকে মর্যাদার চূড়ান্ত আসনে অধিষ্ঠিত করে- সহনশীলতা, দানশীলতা, বিনয়ী ও সদাচার। -ফয়যুল কাদীর, পূর্বোক্ত হাদীস দ্রষ্টব্য।

সাহাবী হযরত জারীর রা. বলেন, আমাকে একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ তোমার চেহারা সুন্দর করেছেন অতএব, তুমি তোমার আখলাক সুন্দর কর। -সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ২/৫৩৪

আদব ও আখলাকের উজ্জল দৃষ্টান্ত

নিম্নে আমাদের আকাবির ও আসলাফের কিছু নমুনা তুলে ধরছি, যারা ছিলেন আদব ও আখলাকের উজ্জল দৃষ্টান্ত। এগুলো পড়লে আমরা বুঝতে পারব, আদব ও আখলাকের ক্ষেত্রে আমাদের কেমন হওয়া উচিৎ।

ইমাম ইবনু সালাহ্ রহ. (৬৪৩ হি.)

তিনি ছিলেন, সর্বোচ্চ আখলাকের অধিকারী। পোশাক পরিচ্ছেদে তিনি বেশ সতর্ক ছিলেন। সবকিছুতে সর্বদা তিনি পরিপাটি ও পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করতেন। তিনি ছাত্রদেরকে এ ব্যাপারে অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। তার দরসে কেউ অসুন্দর ও অপরিচ্ছন্ন থাকলে তিনি তাকে দরসে আসতে কঠিনভাবে নিষেধ করতেন। এমনকি উলামা ও ফুক্বাহাদের মধ্যেও যদি কেউ পাগড়ী না পরে কিংবা জামার বুতাম খোলা রেখে দরসে আসতেন, তিনি তাদেরকেও বারণ করে দিতেন। -আল ইসনাদু মিনাদ দ্বীন, ১১২

ইমাম আবু ইউসুফ রহ. (১৮২ হি.) এর মরণোত্তর ইচ্ছা

ইমাম আসমায়ী রহ. বলেন, আমি ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এর ইন্তেকালের পর তাকে একদিন স্বপ্নে দেখলাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহ্ তো আপনাকে অনেক মর্যাদা সম্পন্ন করেছেন।

কিন্তু আপনি কি এর চাইতেও বেশি কিছু আশা করেন? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি যুহদের (দুনিয়াত্যাগী) ক্ষেত্রে মিসআর ইবনে কিদাম (রহ.), ফিক্বহের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফা (রহ.) আর সদাচার ও সচ্চরিত্রে ইবনে আবী লাইলা (রহ.) এর মত হতে চাই। -তানীবুল খতীব, ৫২

ইলমে নাহুর ইমাম খলীল বিন আহমদ ফারাহেদী (১৭০ হি.)

ইমাম সুফিয়ান ছাউরী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি এমন এক ব্যক্তি কে দেখতে চায়, যাকে মিশক ও স্বর্ণ দ্বারা তৈরী করা হয়েছে, সে যেন খলীল বিন আহমদ কে দেখে নেয়। -সফাহাত মিন সবরিল উলামা, ১৬৫

ইমাম আবু তাহের সিলাফী (৫৭৬ হি.)

একদা ইমাম আবু তাহের সিলাফী রহ. হাদীসের দারস দিচ্ছিলেন, এমন সময় মিশরের সুলতান হাদীস শোনার জন্য দারসে উপস্থিত হলেন। তিনি এসে আরেকজনের সাথে কথা বলতে আরম্ভ করলেন। তখন মুহাদ্দিস সিলাফী রহ. ধমক দিয়ে বললেন, এটা কি হচ্ছে? আমরা এখানে হাদীস পড়ছি আর তোমরা গল্প করছো?

এই সিলাফী রহ. এর বয়স যখন ১০০ পার হয়ে গেছে তখনও তিনি দারসে থাকা অবস্থায় পানি পান করতেন না, থুতু ফেলতেন না, আসন পেতে বসতেন না এমনকি কোন সময় তাঁর পাঁ ও প্রকাশ পেতোনা। –সফাহাত মিন সবরিল উলামা, ৯৪

হাকীম আখতার সাহেব রহ.

হযরত হাকীম আখতার সাহেব রহ. বলেন, আমার প্রথম মুরশিদ শাহ্ আব্দুল গণী ফুলপুরী রহ. যখনই আমাকে বলতেন পানি নিয়ে আসো তখন আমিই হযরতের খেদমতে পানি নিয়ে যেতাম। কখনো অন্য কাউকে বলিনি যে, তুমি গিয়ে দিয়ে আসো। একই আচরণ ছিলো আমার দ্বিতীয় মুরশিদ মাওলানা আবরারুল হক রহ. এর সাথেও।

হযরত মাওলানা আবরারুল হক রহ. এর আব্বাজান মাহমুদুল হক রহ. (যিনি থানবী রহ. এর সোহবতপ্রাপ্ত ছিলেন) একবার বড় এক মজলিসে বললেন, ভাই! নিজের সন্তানকে আরবী পড়াও, আলেম বানাও। কেননা, আমি যখন আমার সন্তানদেরকে পানি আনতে বলি, তখন আমার ইংরেজী শিক্ষিত ছেলেরা চাকরকে বলে, আব্বাকে পানি দাও। অথচ আমার যে ছেলেকে আমি হাফেয বানিয়েছি (মাওলানা) আবরারুল হক, সে দৌড়ে গিয়ে নিজেই পানি এনে আমাকে পান করায়। -তলাবা ও মুদাররিসীন সে খুসূসী খেতাব, ৮

নবীজীর সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের আচরণ

قَالَ عروة بن مسعود فَوَاللَّهِ مَا تَنَخَّمَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم نُخَامَةً إِلاَّ وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمُ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ، وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ، وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ، وَمَا يُحِدُّونَ إِلَيْهِ النَّظَرَ تَعْظِيمًا لَهُ، فَرَجَعَ عُرْوَةُ إِلَى أَصْحَابِهِ فَقَالَ أَىْ قَوْمِ، وَاللَّهِ لَقَدْ وَفَدْتُ عَلَى الْمُلُوكِ، وَوَفَدْتُ عَلَى قَيْصَرَ وَكِسْرَى وَالنَّجَاشِيِّ وَاللَّهِ إِنْ رَأَيْتُ مَلِكًا قَطُّ، يُعَظِّمُهُ أَصْحَابُهُ مَا يُعَظِّمُ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم مُحَمَّدًا، وَاللَّهِ إِنْ تَنَخَّمَ نُخَامَةً إِلاَّ وَقَعَتْ فِي كَفِّ رَجُلٍ مِنْهُمْ، فَدَلَكَ بِهَا وَجْهَهُ وَجِلْدَهُ، وَإِذَا أَمَرَهُمُ ابْتَدَرُوا أَمْرَهُ وَإِذَا تَوَضَّأَ كَادُوا يَقْتَتِلُونَ عَلَى وَضُوئِهِ، وَإِذَا تَكَلَّمَ خَفَضُوا أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَهُ، وَمَا يُحِدُّونَ إِلَيْهِ النَّظَرَ تَعْظِيمًا لَهُ

(হযরত উরয়া রা. তখনও মুসলামন হননি। মক্কা থেকে হুদায়বিয়াতে এসেছিলেন সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা দেখার জন্য। অবস্থা দেখে গিয়ে কাফেরদের কাছে নবীজী ও সাহাবায়ে কেরামের বর্ণনা দেন এভাবে-)

হে আমার কওম, আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা-বাদশাহর নিকটে প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি। কায়সার, কিসরা ও নাজাশী সম্রাটের নিকটে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোন রাজা বাদশাহকেই তার অনুসারীদের মত এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যদি থুথু ফেলে, তখন তা কোন সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলে। সে কোন আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে পালন করে; সে ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে তাঁর সহচরদের মধ্যে প্রতিযোগতিা শুরু হয়; সে কথা বললে, তারা নিশ্চুপ হয়ে শুনে। এমনকি তাঁর সম্মানার্থে তারা তাঁর চেহারার দিকেও তাকায় না। -সহীহ্ বুখারী, ২৭৩২

সাইয়িদ মিঁয়া আসগর হুসাইন রহ.

হযরত মুফতী শফী রহ. বলেন, একবার আমি হযরত সায়্যেদ মিয়াঁ আসগর হুসাইন রহ. এর কাছে গেলাম। আমি তখন দারুল উলূম দেওবন্দের উস্তায। সময়টি ছিল খাবারের সময়। হযরত বললেন, আসো খাবার খাও। আমি খাবারে শরীক হলাম। খাবার শেষে আমি যখন দস্তরখান ভাজ করতে লাগলাম তখন হযরত আমার হাত ধরে ফেললেন এবং বললেন, দস্তরখান ঝারার/পরিস্কারের আদব জানো?

আমি বললাম, হযরত! এ আবার তেমন কী কাজ যে, তা আবার আলাদা শিক্ষা নিতে হবে? বাহিরে নিব আর ঝেরে ফেলে দিব। হযরত বললেন, এজন্যই আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, দস্তরখান ঝারা/পরিস্কার করতে জানো কি না? তোমার কথায় বুঝলাম, আসলে তুমি দস্তরখান ঝারা/পরিস্কারই জানো না। তখন আমি বললাম, হযরত! তাহলে আমাকে শিখিয়ে দিন।

তখন হযরত উক্ত দস্তরখান পুনরায় খুললেন এবং রুটির ছোট ছোট টুকরাগুলো এক জায়গায়, বড় টুকরাগুলো আরেক জায়গায়, গোস্তের ছোট্ট টুকরাগুলো এক জায়গায় এবং হাড্ডিগুলো অন্য জায়গায় জমা করলেন। এরপর বললেন, দেখো! এখানে চারটি জিনিস হলো। আর আমার এখানে এগুলোর জন্য চারটি জায়গা নির্ধারিত আছে।

দেখো, ঐ জায়গাতে বিড়াল আসে সেখানে গোস্তের বড় টুকরাগুলো রাখো, সময় মত বিড়াল এসে খেয়ে নিবে। আর ওখানে হাড্ডি রাখো, মহল্লার কুকুর এসে তা খেয়ে নিবে। রুটির বড় টুকরা গুলো ঐ জায়গায় রাখো, কাক, চিল, পাখী এসে খেয়ে নিবে। আর এখানে রুটির ছোট্ট টুকরাগুলো রাখো, এটা পিঁপড়ার খাবার, সময় হলে পিঁপড়া এই খাবারও খেয়ে নিবে।

অত:পর বললেন, এইসব হচ্ছে আল্লাহ্ তায়ালার রিযিক, যার কোন অংশই নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। হযরত মুফতী শফী রহ. বলেন, ঐ দিন আমি বুঝতে পারলাম, দস্তরখান ঝারা/পরিস্কার করাও একটা ইলম যা কারো কাছ থেকে শিখতে হয়। -ইসলাহী খুতুবাত, ৫/১৫৪-১৫৫ ‘খানে কে আদব’।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

হযরত আয়েশা রা. বলেন, পৃথিবীর কোন ব্যক্তিই সদাচার ও সচ্চরিত্রে নবীজীর মত ছিল না। যে কেউ নবীজীকে ডাকতো নবীজী তার উত্তরে লাব্বাইক বলতেন। মক্কা বিজয়ের পর হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. নিজের বৃদ্ধ, দুর্বল, অন্ধ পিতাকে নবীজীর খেদমতে মুসলমান হওয়ার জন্য উপস্থিত করলেন। নবীজী সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাকে কেন কষ্ট দিলে? আমাকে বললেই তো আমি চলে যেতাম। -রহমাতুললিল আলামিন, ১/৩৫৩-৩৫৫

ইমাম আবু হানীফা রহ. (১৫০ হি.)

ইমামে আ‘যম আবু হানীফা রহ. বলেন, আমি আমার উস্তায ইমাম হাম্মাদ ইবনে আবী সুলাইমান এর বাড়ীর (অনেক দূর হওয়া সত্ত্বেও) দিকে নিজের পাঁ কে কখনো প্রশস্ত করিনি। -আদাবুল ইখতেলাফ, ১৭২

ইমাম শাফেয়ী রহ. (২০৪ হি.)

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, যখন আমি মদিনায় আসলাম তখন আমি ইমাম মালেক রহ. কে দেখে এতো বেশি শিষ্টাচার প্রদর্শন করলাম যে, তার হাদীসের মজলিসে আমি কিতাবের পৃষ্ঠা এমন কোমলভাবে উল্টাতাম যেন এর আওয়াজ তাঁর কানে না পৌঁছে। -প্রাগুক্ত, ১৭৩

রবী ইবনে সুলাইমান রহ.

তিনি ইমাম শাফেয়ী রহ. এর ছাত্র। হযরত রবী ইবনে সুলাইমান বলেন, ইমাম শাফেয়ী রহ. আমার দিকে তাকিয়ে আছেন এ অবস্থায় আমি কোন দিন পানি পান করার সাহস পাইনি। -প্রাগুক্ত, ১৭৩

হযরত মাওলানা আবদুর রউফ (ঢাকার হুজুর) রাহ. (১৯৩৬-২০২৩ ইং)

তিনি গওহরডাঙ্গা মাদরাসার মুহাদ্দিস ও শাইখুল হাদীস ছিলেন। সদর সাহেব রহ. এর খাস শাগরিদ এবং বানুরী রহ. এরও প্রিয় ছাত্র। মুরব্বি মান্যতা একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব। এক্ষেত্রে হযরতের দৃষ্টান্ত একেবারেই বিরল। নিম্নে এ সম্পর্কে তাঁর একটি ঘটনা তুলে ধরা হলো।

ঢাকার হুজুরের মুরব্বি-রাহনুমা ছিলেন মুজাহিদে আজম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (ছদর ছাহেব) রাহ.। তাঁর প্রতি হুজুরের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও মান্যতা ছিল এককথায় বে-নযীর। এখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ঘটনাটি আমি শুনেছি, প্রধানত দুই ব্যক্তির কাছে; একজন হল, আমার নানী শাশুড়ি ছদর ছাহেবের আহলিয়া রাহ.। আরেকজন হল, আমার শফীক উস্তায হযরত মাওলানা শফীউল্লাহ (চৌমুহনী হুজুর) রাহ.। সংশ্লিষ্ট কিছু অংশ শুনেছি গওহরডাঙ্গা মাদরাসার বড় হাফেজ সাহেব; হাফেজ আবদুল হক রাহ.-এর কাছে।

তখন পাকিস্তান আমল। কিছুদিন হল ঢাকার হুজুর বিন্নূরী রাহ.-এর সান্নিধ্য থেকে ফিরেছেন। তিনি গওহরডাঙ্গা মাদরাসার নওজোয়ান উস্তায। দাওরায়ে হাদীসে খুব সম্ভব সুনানে আবু দাউদ পড়ান। একদিন ছদর ছাহেব তাঁকে বললেন, ‘তুমি সারা বছর হাদীস পড়া ও পড়ানোর যেসকল সমস্যা ও জটিলতার সম্মুখীন হবে, যেগুলোর সমাধান তুমি খোঁজ-তালাশ করে পাবে না, সেগুলো নোট করে রাখবে। রমযানের ছুটিতে বিন্নূরী রাহ.-এর কাছে চলে যাবে। তাঁর সান্নিধ্যে সময় কাটাবে এবং তাঁর কাছ থেকে বিষয়গুলো হল করে আসবে। এজন্য তুমি আগ থেকেই টাকা জমাতে থাকবে। যেন একসাথে বড় অঙ্কের টাকার চাপ তোমাকে নিতে না হয়।’ মুরব্বির নির্দেশমতোই ফয়সালা। হুজুর টাকা জমাতে শুরু করলেন। রমযানের আগে যাওয়ারও পাক্কা নিয়ত। কিন্তু পারিবারিক জটিলতার কারণে হুজুর যেতে পারলেন না।

রমযানে হুজুর একদিন মাদরাসায় আসলেন। ছদর ছাহেব তাঁকে দেখে বললেন, তুমি এখানে! তোমার না বিন্নূরী ছাহেবের কাছে যাওয়ার কথা!

ঢাকার হুজুর বললেন, ‘হুজুর! আমার যাওয়ার পাক্কা ইরাদা ছিল। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার পর আব্বা বললেন, আমার তো কিছু টাকার প্রয়োজন। তোমার কাছে কি আছে? থাকলে আমাকে দাও। আব্বা এ কথা বললে, আমি টাকাগুলো আব্বাকে দিয়ে দিয়েছি।’

ছদর ছাহেব বললেন, ‘তুমি কি তোমার আব্বাকে আমার কথা বলেছিলে যে, আমি তোমাকে এই টাকাগুলো এই জন্য রাখতে বলেছি?’

হুজুর বললেন, জী না!

ছদর ছাহেব বললেন, ‘কেন বলনি? এই কথা বলার পরেও যদি তোমার আব্বা বলতেন, টাকাগুলো আমার দরকার, তাহলে তখন তুমি দিতে। কিন্তু তুমি তো সেটা বলইনি!’

ঢাকার হুজুর তখন মেঝেতে বসা ছিলেন আর ছদর ছাহেব ছিলেন চেয়ারে বা খাটে। ছদর ছাহেব হুজুরের হাতে একটি লাঠি ছিল। সেই লাঠি দিয়ে তিনি ঢাকার হুজুরকে পেটানো শুরু করলেন। পেটাচ্ছেন আর বলছেন, ‘তুমি আমার কথা শোনোনি। বের হয়ে যাও আমার এখান থেকে। বের হয়ে যাও। আর আসবে না এখানে।’

তখন ঢাকার হুজুর ছদর ছাহেবের পা জড়িয়ে ধরে বারবার মাফ চাচ্ছেন আর বলছেন, হুজুর আমাকে মাফ করে দেন। আমি যেভাবেই হোক, এখন যাব।

অনেক সময় পর ছদর ছাহেব বললেন, ‘হাঁ, তোমাকে মাফ করতে পারি এক শর্তে; বিন্নূরী ছাহেব যদি তোমাকে গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় রাখার ব্যাপারে আমার কাছে সুপারিশ করেন তাহলে তোমাকে রাখব, না হলে তুমি আমার কাছে থাকতে পারবে না। গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় থাকতে পারবে না।’

ঢাকার হুজুর ছদর ছাহেবের কাছ থেকে উঠে এসে টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে বিন্নূরী রাহ.-এর কাছে চলে গেলেন। বিন্নূরী রাহ.-এর সাহচর্যে সময় অতিবাহিত করতে থাকলেন। এক সুযোগে বিন্নূরী রাহ.-কে ছদর ছাহেবের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা বললেন। বিন্নূরী রাহ. তখন ছদর ছাহেবের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠিতে ঢাকার হুজুরের ইলমী ইস্তে‘দাদ, তাদরীসের সালাহিয়্যাত সম্পর্কে নিজের অভিব্যক্তি ব্যক্ত করে তার জন্য সুপারিশ করলেন। চিঠিটি ঢাকার হুজুর আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন।

এরও পূর্বের ঘটনা হল, ঢাকার হুজুর বিন্নূরী রাহ.-এর কাছে পৌঁছার পর ছদর ছাহেবের কাছে দুআ চেয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ঢাকার হুজুরের পাঠানো এই চিঠি যখন ছদর ছাহেব পড়েন, তখন গওহরডাঙ্গা মাদরাসার বড় হাফেজ সাহেব সামনে ছিলেন। ছদর ছাহেব চিঠিটি পড়ে অত্যন্ত খুশি হন। বড় হাফেজ সাহেবকে বারবার বলতে থাকেন, ‘হাফেজ সাহেব, বলেন বলেন, আবদুর রউফের জন্য কী দুআ করা যায়! তাকে আমি যেভাবে রাগ করেছি, যেভাবে মেরেছি, আমি তো ভেবেছিলাম ও আমার কাছে আর আসবে না। হাফেজ সাহেব, দেখেন, ও আমাকে চিঠি লিখেছে। বলেন, ওর জন্য কী দুআ করব!’

ছদর ছাহেব রাহ.-এর ঐ এক দুআই তো একটি জীবন আলোকিত হয়ে যাওয়ার জন্য অনেক!

ঢাকার হুজুরের মুরব্বি মান্যতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হল, গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় পুরোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া। হুজুরের তো আরো আরামে-আয়েশে থেকে দ্বীনী খেদমতের ব্যবস্থা ছিল। তাঁর ছাত্র-শাগরিদদের পক্ষ থেকে জোর আবদারও ছিল। কিন্তু সব কিছু পেছনে ফেলে হুজুরের কথা ছিল, আমি যদি গওহরডাঙ্গা ছেড়ে যাই, আর কিয়ামতের দিন ছদর ছাহেব যদি আমাকে বলেন, আমি তোমাকে গওহরডাঙ্গা মাদরাসায় রেখে এসেছিলাম আর তুমি সেটা ছেড়ে অমুক জায়গায় চলে গেলে? আমি তখন হযরতকে কী জবাব দেব! তাই আমি গওহরডাঙ্গা ছেড়ে কোথাও যাব না। -আল কাউসার, জানুয়ারী ২০২৪ইং

শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা হাফিযাহুল্লাহ্

‘সফাহাতুন মুযীআতুন মিন হায়াতি সাইয়ীদী আল-ওয়ালেদ আল-আল্লামা মুহাম্মাদ আওয়ামা’ কিতাব থেকে। লেখক: শায়েখ মুহিউদ্দীন আওয়ামা

শায়েখ মুহিউদ্দীন আওয়ামার ভাষায়- ‘আমার ওয়ালেদ মাজেদের ছাত্র যামানার প্রথম দিকের ঘটনা। হালাবের জনৈক বর্ষীয়ান পাগড়ী ও সুবেশধারী শায়েখের আলোচনা উঠল। (সেই শায়েখের উপর আরোপিত বিরূপ মন্তব্যের দায়ভার  তো তাঁর উপর বর্তায়।) ওয়ালেদ মাজেদ সেই বর্ষীয়ান শায়েখের সমালোচনা করে বসলেন। বর্ষীয়ান শায়েখকে নিয়ে এই বাড়ন্ত বালকের সমালোচনা মুহতারাম দাদাজান লক্ষ করলেন। তাঁর সমালোচনা যদিও মোক্ষম ও যথার্থ ছিল; কিন্তু এ দুঃসাহসিকতা ও ব্যাপারটি তাঁকে ক্রোধান্বিত করে তুলল। তিনি তাঁর সন্তানের ব্যাপারে শঙ্কিত ও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এই নিন্দিত ও কুঅভ্যাস নিয়েই তো তাঁর সন্তান বেড়ে উঠবে! তিনি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হলেন। ছেলেকে ভর্ৎসনা করলেন। উপদেশ দিলেন। তাকে সতর্ক করে বললেন-

يا ولدي، والله لو رأيت قطة تخرج من بيت شيخ لاحترمتها.

বৎস! আল্লাহর কসম! যদি কোনো শায়েখের বাড়ী থেকে কেনো বিড়ালীও বের হতে দেখি, তাহলে আমি অবশ্যই তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।

মুহতারাম আব্বাজান সতর্ক ও সচেতন হয়ে গেলেন। বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করলেন। বড়দের যে বিশেষ সম্মান ও বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নতুন বর্ণমালার পাঠ গ্রহণ করলেন। বুঝলেন, বড়দের সমকক্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাই বড়দের মুখোমুখি হতে পারেন। অন্তরঙ্গ ও নিকটস্থ বন্ধুরাই তাঁদের উপর ‘নক্দ’ করতে পারেন।

শায়েখ আবুদর রহমান যাইনুল আবিদীন (১৩৩০ হি.-১৪১০ হি.)

শায়েখ মুহাম্মদ আওয়ামা হাফিযাহুল্লাহ্ তখন [হালাবের বিখ্যাত দ্বীনি বিদ্যাপীঠ] আলমাদরাসাতুশ শাবানিয়া’র [ছানবিয়্যাহ মারহালার] তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। আল্লামা শায়েখ আবুদর রহমান যাইনুল আবিদীন (১৩৩০ হি.-১৪১০ হি.) ইমাম ইবনে হিশামের লেখা কতরুন নাদা কিতাবটি পড়াতেন। তৎকালীন বর্ষীয়ান তবকার শায়েখগণ অনুজ তবকার কথা বাদই দিলাম এই শায়েখ আবুদর রহমানকে বিস্ময় ও উঁচু দৃষ্টিতে দেখতেন। তিনি দরসে ছাত্রদেরকে লক্ষ্য করে বলেন-

والله لو دخل علينا الآن ابن هشام، ورآني أدرس كتابه لخلع حذائه وضربني، وقال لي : أنا لم أؤلف كتابي هذا لتدرسه أنت وأمثالك.

আল্লাহর কসম! যদি ইবনে হিশাম এখন আমাদের এখানে এসে আমাকে দেখেন যে, আমি তাঁর কিতাবের দরস দিচ্ছি, তাহলে তিনি অবশ্যই জুতা খুলে আমাকে প্রহার করতেন এবং বলতেন, আমি এ কিতাব তুমি ও তোমার মত লোকদের অধ্যাপনা করার জন্য লিখিনি।

একটা বিস্ময়বোধ ছাত্রদেরকে আচ্ছন্ন করল। তারা স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হল। সুউচ্চ মাকামের অধিকারী এত বড় শায়েখ (আরবী ভাষায় অসম্ভব পান্ডিত্যের অধিকারী) এরূপ মন্তব্য করছেন! এভাবে হলফ করছেন!  তাহলে ইবনে হিশামের কী মাকাম?! আর এ কিতাবেরই বা কী রূপ মর্যাদা?! ছাত্রদের বুকজুড়ে [নতুন করে] তাঁদের ইমামদের প্রতি মহত্ব ও শ্রদ্ধার একটা আসন তৈরি হল। তাদের মেধায় ও চেতনায় উম্মাহর আলেমগণের সঠিক অবস্থান ও মর্যাদা প্রোথিত হল।

শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.

শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. একবার শায়েখ মুহাম্মদ আওয়ামা সাহেবের সাইয়্যাফিয়্যা কক্ষে আসলেন। আল্লামা আযীযী রাহ. লিখিত ইমাম সুয়ূতী রাহ.-এর আলজামিউস সগীর কিতাবের শরহের একটি নস তিনি মুরাজাআত করছিলেন। শায়েখ নসটি অনেকবারই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি নসটি বিভিন্ন আঙ্গিকে বুঝবার চেষ্টা করলেন। এর যমীরও বিভিন্নদিকে ফিরিয়ে দেখলেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো অর্থ স্পষ্ট হচ্ছিল না এবং কোনো স্থির মর্মার্থও তিনি বের করতে পারছিলেন না। এই মুরুব্বী শায়েখ তাঁর শাগরিদের সামনে ইবারতের অস্পষ্টতার কারণে কিতাবের উপর কিংবা কিতাবের লেখকের উপর কোনো মন্তব্য করলেন না। বরং ছাত্র আওয়ামাকে লক্ষ করে বললেন-

هكذا يقول الشيخ، ونحن لا نحسن الفهم عنه.

শায়েখ এটা বলেছেন; কিন্তু আমরা তা ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারছি না।

সুবহানাল্লাহ্! কী তাঁর শব্দ চয়ন। কিতাবের লেখকেরও তো ভুল হতে পারে। কিন্তু তিনি তা অত্যন্ত আদবের সাথে এড়িয়ে গেলেন। আর বুঝাতে চাইলেন, আসলে লেখকের কোন ভুল নেই। বুঝের স্বল্পতা ও দুর্বলতা আমার। মূলত: আমিই বুঝতে পারছি না।

শায়েখ মুহাম্মাদ মুহিউদ্দীন আওয়ামা বলেন, ওয়ালেদ মাজেদ (শায়েখ আওয়ামা) আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমাদের উস্তায ও শায়েখদেরকে যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ সম্মান করা এবং তাঁদের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় আদব বজায় রেখে চলা আবশ্যক। মুহতারাম ওয়ালেদ আমাদেরকে সবসময় আলেমদের এ উক্তি শিক্ষা দিয়ে থাকেন-

ما فاز من فاز إلا بالأدب، وما سقط من سقط إلا بسوء الأدب.

যাঁরা সফল হয়েছে তাঁরা আদবের কারণেই সফলকাম হয়েছে। আর যারা স্খলিত  হয়েছে বেয়াদবীর কারণেই হয়েছে।

শায়েখ আব্দুল্লাহ্ সিরাজুদ্দীন রাহ.-এর সাথে শায়েখ আওয়ামা সাহেবের আদব

১৪০৪ হিজরীতে ফযীলাতুশ শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীন (১৩৪৩ হি.-১৪২২ হি.) [রাষ্ট্রীয় গোলযোগের কারণে]  মদীনা মুনাওয়ারায় [প্রায় চার বছর] অবস্থান করার পর যখন তাঁর স্বদেশ হালাবে ফিরে আসেন, তখন আমার মুহতারাম আব্বাজান (শায়েখ আওয়ামা) শায়েখের সঙ্গে উভয়ের মাঝে নিগুঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আদবে ও লজ্জায়, সম্মান ও মর্যাদায় ফোনে যোগাযোগ ও কথোপকথন করতে দুঃসাহস করতে পারেননি।  যদিও আমার মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদ (শায়েখ আওয়ামা) তাঁর এক খাস শাগরিদের মাধ্যমে শাইখ মুহাম্মাদ আলী আল-ইদলিবী, মাদরাসাতুশ শা‘বানিয়ার অন্যতম কর্তাব্যক্তি শাইখের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন। ছোট বড় সব বিষয়ে পরামর্শ করতেন। ফজীলাতুশ শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীনও তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন।

আমার মুহতারাম আব্বাজান (শায়েখ আওয়ামা) ফজীলাতুশ শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীনের সাথে  বেশ কয়েক বছরের মাঝে মাত্র একবার  [ফোনে] কথা বলেছেন। তাও দরখাস্ত ও অনুমতি তলব করার পর। এরূপ দুঃসাহসিকতার জন্য ওজরখাহি করে। এটি শায়েখের হলবে ফিরে আসার ১৫ বছর পরের ঘটনা। এই কথোপকথনের সময় একমাত্র আমিই মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদের পাশে ছিলাম। সেই কথোপকথনের একটি অংশ যা আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সংরক্ষিত আছে এরূপ : ফোনে কথা বলার শুরুতে মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদ (শায়েখ আওয়ামা) তাঁর শায়েখের কাছে নিবেদন করেন, যেন শায়েখের দিল-মন তার প্রতি রাজী-খুশী থাকে। ওয়ালেদ মাজেদ এ বাক্যটি ছাড়া আর কোনো বাক্য বলেননি। আর শায়েখ রাহ. আব্বাজানের জন্য কথোপকথনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহতভাবে দীর্ঘ দুআ করেন।

শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা

আমার আব্বাজান (শায়েখ আওয়ামা) তাঁর প্রিয় শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. এর সাথে একবারের জন্যও বসা অবস্থায় ফোনে কথা বলেছেন এরূপ কোনো দৃশ্য আমার স্মৃতির সঞ্চয়ে নেই। অথচ উভয়ের মাঝে ছিল অধিক ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং শায়েখের সাথে ওয়ালেদ মাজেদের সার্বক্ষণিক ইলমী বিষয়ের আলোচনা ও আদান-প্রদান। বিষয়টি আমাদের কাছে এমন হয়ে গিয়েছিল যে, যখন তিনি ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে যেতেন তখন আমরা বুঝতে পারতাম যে, তিনি নিশ্চয় শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.।

একবারের কথা মনে পড়ছে। তথাকথিত জামিয়ায় পড়ালেখা করা জনৈক ভাই মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদকে শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর পুত্র শায়েখ সালমানের সামনে আদবপূর্ণ ভঙ্গিতে উপবেসনের উপর আপত্তি করেন। অথচ সালমান বিন আব্দুল ফাত্তাহ হলেন মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদের ছেলের বয়সের। আমি আপত্তিকারী ভাইকে জবাব দিলাম, ‘এটাই হল মাশায়েখদের তরবিয়াত ও তথাকথিত জামিআর তরবিয়াতের মধ্যকার পার্থক্য।’ -আল কাউসার, মার্চ ২০ ইং, কিছু পরিমার্জিত, সংযোজিত ও সংক্ষেপিত।

Check Also

আল্লাহু আকবার বাক্যে আলিফ অথবা ‘বা’ টেনে পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে কি?

প্রশ্ন :  আল্লাহু আকবার বাক্যে আলিফ অথবা ‘বা’ টেনে পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে কি? জনৈক …

সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ৪

সালাফী আকীদা; মহান আল্লাহর আরেকটি বিশেষণ আরশের উপর ইসতিওয়া সালাফী আকীদা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় সামনে আসে, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!