সালাফী আকীদা সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার রহ.
সালাফী আকীদা সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার রহ. সালাফদের আকীদা ও মাযহাব উল্লেখ করে বলেন, (আলোচনাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আমরা এর অনুবাদও এখানে উল্লেখ করব)
فتح الباري : ( قوله باب وكان عرشه على الماء وهو رب العرش العظيم )
واخرج أبو القاسم اللالكائي في كتاب السنة من طريق الحسن البصري عن أمه عن أم سلمة انها قالت الاستواء غير مجهول والكيف غير معقول والاقرار به إيمان والجحود به كفر
হযরত উম্মে সালামা বলেন, ‘ইস্তিওয়া’ অজানা নয়, ‘কেমন’ (প্রশ্ন করা) অযৌক্তিক, স্বীকার করা ঈমান, আর অস্বীকার করা কুফরী।
ومن طريق ربيعة بن أبي عبد الرحمن انه سئل كيف استوى على العرش فقال الاستواء غير مجهول والكيف غير معقول وعلى الله الرسالة وعلى رسوله البلاغ وعلينا التسليم
রবিয়া বিন আবু আব্দির রহমান রহ. কে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ইস্তাওয়া আলাল আরশি’ কেমন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘ইস্তিওয়া’ অজানা নয়, ‘কেমন’ (প্রশ্ন করা) অযৌক্তিক, আল্লাহ তাঁর রাসূলের কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন। রাসূল সেটি পৌঁছিয়েছেন। আমাদের কাজ সমর্পণ ও স্বীকৃতি।
واخرج البيهقي بسند جيد عن الأوزاعي قال كنا والتابعون متوافرون نقول ان الله على عرشه ونؤمن بما وردت به السنة من صفاته
ইমাম বাইহাকী জায়্যিদ সনদে ইমাম আওযায়ী রহ. থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আওযায়ী রহ. বলেন, আমরা এবং সকল তাবেঈনে কেরাম বলি, আল্লাহ্ তায়ালা আরশের উর্দ্ধে। তাঁর সিফাত সম্পর্কে যেভাবে সুন্নাহয় এসেছে আমরা সেভাবেই ঈমান রাখি।
وأخرج الثعلبي من وجه آخر عن الأوزاعي انه سئل عن قوله تعالى ثم استوى على العرش فقال هو كما وصف نفسه
ইমাম আওযায়ী রহ. কে ‘ইস্তাওয়া আলাল আরশি’ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, তিনি তেমন, নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেন যেমন।
وأخرج البيهقي بسند جيد عن عبد الله بن وهب قال كنا عند مالك فدخل رجل فقال يا أبا عبد الله الرحمن على العرش استوى كيف استوى فأطرق مالك فأخذته الرحضاء ثم رفع رأسه فقال الرحمن على العرش استوى كما وصف به نفسه ولا يقال كيف وكيف عنه مرفوع وما أراك الا صاحب بدعة أخرجوه ومن طريق يحيى بن يحيى عن مالك نحو المنقول عن أم سلمة لكن قال فيه والاقرار به واجب والسؤال عنه بدعة
ইমাম বাইহাকী রহ. জায়্যিদ সনদে এনেছেন, আব্দুল্লাহ্ বিন ওয়াহাব রহ. বলেন, একদা আমরা ইমাম মালেক রহ. এর কাছে ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি এসে প্রশ্ন করল, হে আবু আব্দিল্লাহ্! ‘আর রহমানু আলাল আরশিস্তাওয়া, এর মধ্যে ‘ইস্তাওয়া’ কেমন? ইমাম মালেক রহ. মাথা নিচের দিকে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা উঠিয়ে বললেন, তাঁর ‘ইস্তেওয়া’ তেমন, নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেন যেমন। এখানে ‘কেমন’ বলে প্রশ্ন করা যাবে না। তিনি ‘কেমন’ প্রশ্নের উর্দ্ধে। আমি তো দেখছি, তুমি একজন বেদআতী।
একই কথা হযরত উম্মে সালামা থেকে রয়েছে। সেখানে তিনি আরো বলেন, স্বীকার করা ওয়াজিব এবং এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা বিদআত।
وأخرج البيهقي من طريق أبي داود الطيالسي قال كان سفيان الثوري وشعبة وحماد بن زيد وحماد بن سلمة وشريك وأبو عوانة لا يحددون ولا يشبهون ويروون هذه الأحاديث ولا يقولون كيف قال أبو داود وهو قولنا قال البيهقي وعلى هذا مضى أكابرنا
আবু দাউদ তায়ালিসী রহ. বলেন, ইমাম সুফিয়ান ছাওরী, শু‘বা, হাম্মাদ বিন যায়েদ, হাম্মাদ বিন সালামা, শারীক এবং আবু আওয়ানা প্রমুখ ইমামগণ তাহদীদ (সংজ্ঞায়িত/সীমা-পরিসীমা) তাশবীহ (অনুরুপ) করতেন না। তারা কেবল এসকল হাদীসগুলো বর্ণনা করে যেতেন। কিন্তু ‘কেমন’ এ জাতীয় কথা বলতেন না। আবু দাউদ তায়ালিসী রহ. বলেন, এটাই আমাদের মত। ইমাম বাইহাকী রহ. বলেন, আমাদের আকাবীর-আসলাফগণ এই মতের উপরই ছিলেন।
وأسند اللالكائي عن محمد بن الحسن الشيباني قال اتفق الفقهاء كلهم من المشرق إلى المغرب على الإيمان بالقرآن وبالأحاديث التي جاء بها الثقات عن رسول الله صلى الله عليه و سلم في صفة الرب من غير تشبيه ولا تفسير فمن فسر شيئا منها وقال بقول جهم فقد خرج عما كان عليه النبي صلى الله عليه و سلم وأصحابه وفارق الجماعة لأنه وصف الرب بصفة لا شيء
ইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান শাইবানী রহ. বলেন, পৃথিবীর সকল ফকীহ্ একমত, কুরআন ও সহীহ্ হাদীসে আল্লাহ্ তায়ালার যে সকল সিফাত সমূহের বর্ণনা রয়েছে তার উপর ঈমান আনতে হবে তাশবীহ্ এবং তাফসীর ছাড়া। যে এগুলোর তাফসীর করবে সে নবীজী, সাহাবী এবং আহলুস সুন্নাহ্ ওয়াল জামাআহ্ থেকে বের হয়ে যাবে। কারণ সে মহান আল্লাহকে নেতিবাচক ও অবিদ্যমানতার বিশেষণে বিশেষিত করে।
ومن طريق الوليد بن مسلم سألت الأوزاعي ومالكا والثوري والليث بن سعد عن الأحاديث التي فيها الصفة فقالوا أمِرُّوْها كما جاءت بلا كيف
ওয়ালিদ বিন মুসলিম বলেন, আমি ইমাম আওযায়ী, মালেক, ছাওরী, লাইছ বিন সা‘দ প্রমূখ ইমামগণকে আল্লাহর সিফাত সম্বলীত হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তখন তারা বলেছেন, অবস্থার বিবরণ ব্যতিত এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই রাখো।
وأخرج بن أبي حاتم في مناقب الشافعي عن يونس بن عبد الأعلى سمعت الشافعي يقول لله أسماء وصفات لا يسع أحدا ردها ومن خالف بعد ثبوت الحجة عليه فقد كفر واما قبل قيام الحجة فإنه يعذر بالجهل لأن علم ذلك لا يدرك بالعقل ولا الرؤية والفكر فنثبت هذه الصفات وننفي عنه التشبيه كما نفى عن نفسه فقال ليس كمثله شيء.
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, আল্লাহর নাম ও সিফাত সমূহ কে অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যাবে। ……. আমরা সিফাতগুলো কে তাশবীহ্ বিহীন মেনে নিই। কারণ, আল্লাহ্ বলেন, কোন বস্তু তাঁর মত নয়।
وأسند البيهقي بسند صحيح عن احمد بن أبي الحواري عن سفيان بن عيينة قال كل ما وصف الله به نفسه في كتابه فتفسيره تلاوته والسكوت عنه
ইমাম বাইহাকী রহ. সহীহ্ সনদে এনেছেন, ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, আল্লাহ্ তায়ালা নিজের সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে যেভাবে বর্ণনা করেছেন তার তাফসীর বা ব্যাখ্যা হলো, তা তেলাওয়াত করা এবং চুপ থাকা।
ومن طريق أبي بكر الضبعي قال مذهب أهل السنة في قوله الرحمن على العرش استوى قال بلا كيف والآثار فيه عن السلف كثيرة وهذه طريقة الشافعي وأحمد بن حنبل
আবু বকর যাবয়ী রহ. বলেন, ‘আর রহমানু আলাল আরশিস্তাওয়া’ সম্পর্কে আহলুস-সুন্নাহ্ ওয়াল জামাআ‘র মাযহাব হলো, এর কোন অবস্থার বিবরণ নেই। সালাফ থেকে এ সম্পর্কীয় অসংখ্য আছার বর্ণিত হয়েছে। এটাই ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর মাযহাব।
وقال بن عبد البر أهل السنة مجمعون على الإقرار بهذه الصفات الواردة في الكتاب والسنة ولم يكيفوا شيئا منها
হাফেয ইবনু আব্দিল বার রহ. বলেন, কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত এসকল সিফাত সমূহ স্বীকার করার ব্যাপারে আহলুস-সুন্নাহ্ ওয়াল জামাআ‘র সকলেই একমত। তারা এই সিফাতগুলোর কোন অবস্থা বর্ণনা করেন না।
وقال امام الحرمين في الرسالة النظامية اختلفت مسالك العلماء في هذه الظواهر فرأى بعضهم تأويلها والتزم ذلك في آي الكتاب وما يصح من السنن وذهب أئمة السلف إلى الانكفاف عن التأويل واجراء الظواهر على مواردها وتفويض معانيها إلى الله تعالى والذي نرتضيه رأيا وندين الله به عقيدة اتباع سلف الأمة للدليل القاطع على ان إجماع الأمة حجة فلو كان تأويل هذه الظواهر حتما لا وشك ان يكون اهتمامهم به فوق اهتمامهم بفروع الشريعة وإذا انصرم عصر الصحابة والتابعين على الاضراب عن التأويل كان ذلك هو الوجه المتبع انتهى
ইমামুল হারামাইন জুওয়াইনি রহ. বলেন, এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ কুরআন ও সহীহ্ হাদীস সমূহে তাবীল করার মত ব্যক্ত করেছেন।
আর উলামায়ে সালাফ এর মাযহাব হলো, তাবীল থেকে বিরত থাকা এবং এ সম্পর্কীয় আয়াত-হাদীসগুলো তার যাহের এর উপর রেখে অর্থের বিষয়টি আল্লহর উপর ন্যাস্ত করা।
আমরা যে মতে সন্তুষ্ট এবং আল্লাহর ব্যাপারে যে আকীদায় বিশ্বাসী সেটা হলো, উম্মাহর সালাফের অনুসরণ। কারণ, উম্মতের এজমা‘ই দলীল। যদি এগুলোর তাবীল জরুরী কোন বিষয় হতো, তাহলে সালাফগণ শরীয়তের শাখাগত বিষয়ের প্রতি গুরুত্বারোপ করার চাইতে এ সকল আয়াত-হাদীসের তাবীলের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতেন। সুতরাং সাহাবা-তাবেঈনের যুগ যখন তাবীল বিহীন গত হয়েছে, তাই এটাই অনুসরণীয় পথ ও পদ্ধতি।
অত:পর হাফেয ইবেন হাজার রহ. বলেন,
وقد تقدم النقل عن أهل العصر الثالث وهم فقهاء الأمصار كالثوري والأوزاعي ومالك والليث ومن عاصرهم وكذا من أخذ عنهم من الأئمة فكيف لا يوثق بما اتفق عليه أهل القرون الثلاثة وهم خير القرون بشهادة صاحب الشريعة.
পেছনে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর ফুকাহায়ে কেরাম যথা: ছাওরী, আওযায়ী, মালেক, লাইছ সহ তাদের সমসাময়িক, এমনিভাবে তাদের থেকে যারা গ্রহণ করেছেন তাদের বক্তব্যগুলো উল্লেখিত হয়েছে। তাহলে নবীজীর পক্ষ থেকে কল্যাণের সনদপ্রাপ্ত তিন শতাব্দির উলামাগণ যার উপর একমত হয়েছেন, কিভাবে তার উপর ভরসা করা যাবে না? (মানে এটাই অনুসরণীয়।) –ফাতহুল বারী, অধ্যায়- ‘ওয়া কানা আরশুহু আলাল মা‘ ’।
সালাফের আরো কিছু বক্তব্য দেখুন
الأسماء والصفات للبيهقي : باب ما جاء في قول الله عز وجل : (هل ينظرون إلا أن يأتيهم الله في ظلل من الغمام والملائكة (905-907)
قال إسحاق بن راهويه : سألني ابن طاهر عن حديث النبي صلى الله عليه وسلم ـ يعني في النزول ـ فقلت له : النزول بلا كيف .
ইসহাক বিন রাহুয়াহ রহ. বলেন, ইবনে তাহের আমাকে নবীজীর হাদীস (আল্লাহর) ‘নুযূল’ বা অবতরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমি বললাম, কোন অবস্থা ও প্রকৃতি বিহীন অবতরণ।
قال أبو سليمان الخطابي : هذا الحديث وما أشبهه من الأحاديث في الصفات كان مذهب السلف فيها الإيمان بها ، وإجراءها على ظاهرها ونفي الكيفية عنها .
আবু সুলাইমান খাত্তাবী রহ. বলেন, উক্ত হাদীস এবং সিফাত সম্পর্কীয় এ জাতীয় হাদীসের ক্ষেত্রে সালাফের মাযহাব হলো, এগুলোর উপর ঈমান আনা এবং এগুলো কে তার যাহেরের উপর রেখে দেওয়া। সাথে সাথে কোন রকমের অবস্থার বর্ণনা দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
عن الزهري ، ومكحول ، قالا : أمضوا الأحاديث على ما جاءت
ইমাম যুহরী, মাকহুল রহ. বলেন, হাদীসগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দাও।
سئل الأوزاعي ومالك وسفيان الثوري والليث بن سعد عن هذه الأحاديث التي جاءت في التشبيه فقالوا : أمِرُّوها كما جاءت بلا كيفية
ইমাম আওযায়ী, মালেক, ছাওরী, লাইস বিন সা‘দ রহ. কে তাশবীহপূর্ণ হাদীস সমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা বললেন, কোন অবস্থার বিবরণ ব্যতিত হাদীসগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই রেখে দাও।
-বাইহাকী কৃত ‘আল-আসমা ওয়াস সিফাত’ ৯০৫-৯০৭ নং বর্ণনা
সালাফের বক্তব্য থেকে আমরা যা বুঝলাম
আল্লাহ্ তায়ালার হাত, পা ইত্যাদী সম্পর্কীয় যে আয়াত বা হাদীস রয়েছে সেগুলোর প্রতি আমাদের পূর্ণ ঈমান আনা জরুরী। কিন্তু সেগুলো কেমন ছিল, তা জানি না এবং কেমন ছিল তা বলাও যাবে না। কারণ, এরকম বললে তাঁর আকার-আকৃতি আমরা তৈরী করে ফেললাম।
সালাফের নীতি এটাই ছিল। তারা এগুলো পড়তেন, ঈমান আনতেন আর বলতেন তোমরাও পড় আর এর প্রতি ঈমান আনো- أمروها/أمضوها كما جاءت بلا كيفية। কিন্তু এগুলো কেমন তা বলতে যেয়ো না। অর্থাৎ, চুপ থাকো। এগুলোর তাফসীল, তাফসীর করা মানেই পদস্খলন হওয়া। কারণ, তখন তাঁর জন্য আকার-আকৃতি সাব্যস্থ করা হয়ে যাবে।
প্রথম পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব
আহলে সালাফ মিডিয়া সার্ভিস Ahle Salaf Media Service
২ comments
Pingback: সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ৪
Pingback: সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ১