হোম / প্রশ্নোত্তর / রমযানের ক্যালেন্ডারে রহমত, মাগফেরাত, নাজাত এই তিন ভাগে ভাগ করা কি জায়েয?

রমযানের ক্যালেন্ডারে রহমত, মাগফেরাত, নাজাত এই তিন ভাগে ভাগ করা কি জায়েয?

প্রশ্ন :

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

হুজুর! রমযানের ক্যালেন্ডারে রহমত, মাগফেরাত, নাজাত এই তিন ভাগে ভাগ করা কি জায়েয? আমাদের দেশের রমযানের ক্যালেন্ডারগুলোতে রমযানের রোযাসমূহ তিন ভাগে ভাগ করে থাকে। রহমত, মাগফেরাত, নাজাত। রমযান মাস কি আসলে তিন ভাগে বিভক্ত? এ সম্পর্কে কোন হাদীস আছে? নাকি এসব শুধু লোকমুখে কথিত, প্রচারিত? বিস্তারিত জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর :

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

রমযানের ক্যালেন্ডারে রহমত, মাগফেরাত, নাজাত এই তিন ভাগে ভাগ করা কি জায়েয?

হযরত সালমান ফারসী রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত একটি হাদীসে উক্ত কথাটি এসেছে। হাদীসটি সহীহ্ ইবনে খুযাইমাতে রমযান মাসের ফযিলত অধ্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে।

হাদীসটির পূর্ণ পাঠ

حديث سلمان رواه ابن خزيمة في صحيحه فقال : باب في فضائل شهر رمضان إن صح الخبر، ثم قال : حدثنا على بن حجر السعدي حدثنا يوسف بن زياد حدثنا همام بن يحيى عن علي بن زيد بن جدعان عن سعيد بن المسيب عن سلمان قال : خطبنا رسول الله صلى الله عليه وسلم في آخر يوم من شعبان فقال :

(أيها الناس، قد أظلكم شهر عظيم، شهر مبارك، شهر فيه ليلة خير من ألف شهر، جعل الله صيامه فريضة، وقيام ليله تطوعاً، من تقرب فيه بخصلة من الخير كان كمن أدى فريضة فيما سواه، ومن أدى فيه فريضة كان كمن أدى سبعين فريضة فيما سواه، وهو شهر الصبر، والصبر ثوابه الجنة، وشهر المواساة، وشهر يزداد فيه رزق المؤمن، من فطر فيه صائماً كان مغفرة لذنوبه، وعتق رقبته من النار، وكان له مثل أجره من غير أن ينتقص من أجره شيء .

قالوا : ليس كلنا نجد ما يفطر الصائم، فقال: يعطي الله هذا الثواب من فطر صائماً على تمرة أو شربة ماء أو مذقة لبن، وهو شهر أوله رحمة، وأوسطه مغفرة، وآخره عتق من النار، من خفف عن مملوكه غفر الله له، وأعتقه من النار، فاستكثروا فيه من أربع خصال : خصلتين ترضون بهما ربكم، وخصلتين لا غنى بكم عنهما. فأما الخصلتان اللتان ترضون بهما ربكم : فشهادة أن لا إله إلا الله، وتستغفرونه، وأما اللتان لا غنى بكم عنهما : فتسألون الله الجنة، وتعوذون به من النار، ومن أشبع فيه صائماً سقاه الله من حوضي شربةً لا يظمأ حتى يدخل الجنة).

হাদীসের অর্থ

একবার শাবান মাসের শেষ দিন রাসূলুল্লাহ আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবা (ভাষণ) দিলেন। খুতবা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, হে লোকেরা! তোমাদের নিকট এক মহান মাস হাজির হয়েছে। এক বরকতময় মাস এসেছে। এ মাসে এমন এক রাত আছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ মাসে সিয়াম পালন করা আল্লাহ ফরজ করেছেন এবং এ মাসের রাতে কিয়াম (নামায আদায়) করা নফল করেছেন।

এ মাসে যে কোন একটি (নফল) ভালো কাজ করা অন্য মাসে একটি ফরজ কাজ করার সমান। আর এ মাসে কোন একটি ফরজ আমল করা অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আমল করার সমান। এটি হল ধৈর্য্যের মাস; ধৈর্য্যের প্রতিদান হচ্ছে- জান্নাত। এটি হল- সহানুভূতির মাস। এটি এমন এক মাস যাতে একজন মুমিনের রিযিক বৃদ্ধি পায়।

এ মাসে যে ব্যক্তি কোন একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে তার সমূহ গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে, সে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে এবং তাকে সেই রোজাদারের সমান সওয়াব দেয়া হবে; কিন্তু রোজাদারের সওয়াবে কোন কমতি করা হবে না। তারা বললো, আমাদের মধ্যে সবার তো একজন রোজাদারকে ইফতার করানোর মত সামর্থ্য নেই।

তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, কোন ব্যক্তি যদি একজন রোজাদারকে একটি খেজুর অথবা এক ঢোক পানি অথবা এক চুমুক দুধ দিয়েও ইফতার করায় আল্লাহ তাকেও এই সওয়াব দিবেন। এটি এমন মাস এর প্রথম ভাগে রহমত, দ্বিতীয় ভাগে মাগফিরাত এবং শেষ ভাগে রয়েছে জাহান্নাম হতে নাজাত। আর যে ব্যক্তি তার কৃতদাসের দায়িত্ব সহজ করে দিবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন এবং জাহান্নাম থেকে তাকে মুক্তি দিবেন।

সুতরাং এ মাসে তোমরা চারটি কাজ বেশি করে করবে। দুটি হল যা দিয়ে তোমরা নিজেদের রব্বকে সন্তুষ্ট করবে। আর দুটি কাজ এমন যা তোমাদের না করলেই নয়। যে দুটি কাজ দ্বারা তোমরা নিজেদের রব্বকে সন্তুষ্ট করবে, (১) এ বলে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ (উপাস্য) নেই এবং (২) তাঁর কাছে ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করবে। আর যে দুটো কাজ তোমাদের না করলেই নয় (৩) তোমরা আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করবে এবং (৪) জাহান্নামের আগুন থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে।

আর এই মাসে যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে পেট ভরে খাওয়াবে আল্লাহ তাঁকে আমার হাউজ থেকে এক ঢোক পানি পান করাবেন যার ফলে সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করা পর্যন্ত আর পিপাসার্ত হবে না।

এই হাদীসে রমযান মাসকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, রহমত, মাগফেরাত ও নাজাত। কিন্তু হাদীসটি দুর্বল। স্বয়ং ইবনে খুযাইমা রহ. নিজেই অধ্যায়ের মধ্যে বলে দিয়েছেন, ‘ইন সহহাল খবারু’। সৌদি আরবের লাজনা থেকে হাদীসটিকে দুর্বল বলা হয়েছে এবং আরো বলা হয়েছে যে, হাদীসটি যদিও জাল নয়, তারপরও রমযানের ফযিলত সম্পর্কে আরো অসংখ্য হাদীস রয়েছে সেগুলোই বলা উচিৎ। উক্ত হাদীসটি বর্ণনা না করাই ভালো।

সৌদি আরবের লাজনা থেকে হাদীসটিকে দুর্বল বলা হয়েছে

وفي سنده على بن زيد بن جدعان وهو ضعيف لسوء حفظه، وفي سنده أيضاً يوسف بن زياد البصري وهو منكر الحديث، وفيه أيضاً همام بن يحيى بن دينار العودي قال فيه ابن حجر في التقريب : ثقة ربما وهم .وعلى هذا؛ فالحديث بهذا السند ليس بمكذوب، لكنه ضعيف، ومع ذلك ففضائل رمضان كثيرة ثابتة في الأحاديث الصحيحة. وبالله التوفيق، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم” انتهى .-اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والإفتاء .الشيخ عبد العزيز بن عبد الله بن باز … الشيخ عبد الرزاق عفيفي … الشيخ عبد الله بن غديان … الشيخ عبد الله بن قعود .”فتاوى اللجنة الدائمة للبحوث العلمية والإفتاء” (10/84- 86) .

শায়েখ আলবানী রহ. উক্ত হাদীসকে দুর্বল বলেছেন

শায়েখ আলবানী রহ. উক্ত হাদীসকে দুর্বল বলেছেন এবং বলেছেন উক্ত হাদীসের সকল ‘মুতাবাআত’ দুর্বল। এই হাদীসের একাধিক বিষয় আপত্তিকর। তিনি পয়েন্ট ধরে ধরে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। নিম্নে তার বক্তব্য উল্লেখ করা হলো,

قال الشيخ الألباني في (سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة) ج2/262 رقم (871) فيتبين ضعف إسناد هذا الحديث ومتابعته كلها ضعيفة، وحكم المحدثين عليه بالنكارة، إضافة إلى اشتماله على عبارات في ثبوتها نظر، مثل تقسيم الشهر قسمة ثلاثية: العشر الأولى عشر الرحمة ثم المغفرة ثم العتق من النار وهذه لا دليل عليها، بل فضل الله واسع، ورمضان كله رحمة ومغفرة، ولله عتقاء في كل ليلة، وعند الفطر كما ثبتت بذلك الأحاديث.

وأيضاً: في الحديث من تقرب فيه بخصلة من الخير كمن أدى فريضة وهذا لا دليل عليه بل النافلة نافلة والفريضة فريضة في رمضان وغيره، وفي الحديث أيضاً: من أدى فيه فريضة كان كمن أدى سبعين فريضة فيما سواه وفي هذا التحديد نظر، إذ الحسنة بعشر أمثالها، ولا يخص من ذلك إلا الصيام فإن أجره عظيم دون تحديد بمقدار، للحديث القدسي كل عمل ابن آدم له إلا الصوم فإنه لي وأنا أجزي به متفق عليه من حديث أبي هريرة رضي الله عنه. فينبغي الحذر من الأحاديث الضعيفة، والتثبت من درجتها قبل التحديث بها، والحرص على انتقاء الأحاديث الصحيحة في فضل رمضان، وفق الله الجميع وتقبل منا الصيام والقيام وسائر الأعمال.

তাই হাদীসটি মউযু বা জাল না হলেও উক্ত হাদীস বর্ণনা করা থেকে বিরত থাকাই ভালো। ফাযায়েলে রমযান সংক্রান্ত সহীহ্ হাদীসগুলো প্রচার-প্রসার করা উচিৎ। আর আমাদের দেশের ক্যালেন্ডারগুলোতেও এই বিষয়টি না লেখা উচিৎ।

আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের কে তৌফিক্ব দান করুন। আমীন।

Check Also

আল্লাহু আকবার বাক্যে আলিফ অথবা ‘বা’ টেনে পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে কি?

প্রশ্ন :  আল্লাহু আকবার বাক্যে আলিফ অথবা ‘বা’ টেনে পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে কি? জনৈক …

সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ৪

সালাফী আকীদা; মহান আল্লাহর আরেকটি বিশেষণ আরশের উপর ইসতিওয়া সালাফী আকীদা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় সামনে আসে, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!