হোম / প্রশ্নোত্তর / সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না?

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না?

প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? আমি মুহা. আব্দুল্লাহ্। নরসিংদী পলাশ থেকে। আমার জানার বিষয় হলো, সব সময় আমরা সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় করে থাকি। বর্তমানে কিছু আলেমকে আমরা দেখতে পাই, তারা বলেন, সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে না।

তাদের দলীল স্পষ্ট যে, নবীযুগে তো স্বর্ণ রুপার মুদ্রা ছিল। তারপরও তো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুদ্রা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে বলেননি। বরং ৫টি বস্তু দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায়ের কথা বলেছেন। তাহলে আমরা কেন? টাকা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করব?

নরসিংদী, পলাশ থেকে।

উত্তর :

ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

সংক্ষিপ্ত সূচীপত্র

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না?

সদকাতুল ফিতর হাদীসে বর্ণিত বস্তু দিয়ে যেমন আদায় করা যায়, তেমনি সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় করা যায়। প্রথমে আমরা হাদীসে বর্ণিত বস্তুগুলো দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করার দলীলগুলো উল্লেখ করছি।

হাদীসে বর্ণিত বস্তু দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায়

عن أَبَي سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ يَقُولُ كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ. بخاري: 1506

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য অথবা এক সা‘ পরিমাণ যব অথবা এক সা‘ পরিমাণ খেজুর অথবা এক সা পরিমাণ পনির অথবা এক সা‘ পরিমাণ কিসমিস দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম। -সহীহ্ বুখারী, ১৫০৬।

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ كُنَّا نُخْرِجُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ وَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ وَكَانَ طَعَامَنَا الشَّعِيرُ وَالزَّبِيبُ وَالأَقِطُ وَالتَّمْرُ

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগে ঈদের দিন এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য সাদাকাতুল ফিতর হিসেবে আদায় করতাম। আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন, আমাদের খাদ্যদ্রব্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর। -সহীহ্ বুখারী ১৫১০

এখানে লক্ষণীয় হলো, হাদীসে ‘সাআন মিন তআমিন’ এর ব্যাথ্যা এখানে করা হয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের খাদ্য ছিল যব, কিসমিস, পনির, খেজুর।

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ مُنَادِيًا فِي فِجَاجِ مَكَّةَ ‏ “‏ أَلاَ إِنَّ صَدَقَةَ الْفِطْرِ وَاجِبَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ مُدَّانِ مِنْ قَمْحٍ أَوْ سِوَاهُ صَاعٌ مِنْ طَعَامٍ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ ‏.‏ ترمذي: 674

আমর ইবনু শুআইব (রাহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অলিতেগলিতে লোক পাঠিয়ে ঘোষণা করলেনঃ জেনে রাখ! প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষ, আযাদ-গোলাম, ছোট অথবা বড় সকলের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। এর পরিমাণ হল, (মাথাপিছু) দুই মুদ (আধা সা‘) গম অথবা এটা ছাড়া এক সা’ পরিমাণ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য। -তিরমিযী ৬৭৪

عَنِ الْحَسَنِ، قَالَ خَطَبَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَحِمَهُ اللهُ فِي آخِرِ رَمَضَانَ عَلَى مِنْبَرِ الْبَصْرَةِ فَقَالَ أَخْرِجُوا صَدَقَةَ صَوْمِكُمْ فَكَأَنَّ النَّاسَ لَمْ يَعْلَمُوا فَقَالَ مَنْ هَا هُنَا مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ قُومُوا إِلَى إِخْوَانِكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم هَذِهِ الصَّدَقَةَ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ أَوْ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ قَمْحٍ عَلَى كُلِّ حُرٍّ أَوْ مَمْلُوكٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ فَلَمَّا قَدِمَ عَلِيٌّ – رضى الله عنه – رَأَى رُخْصَ السِّعْرِ قَالَ قَدْ أَوْسَعَ اللهُ عَلَيْكُمْ فَلَوْ جَعَلْتُمُوهُ صَاعًا مِنْ كُلِّ شَىْءٍ ‏.‏ أبو داود: 1622

হাসান বসরী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত, একদা ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) রমাযানের শেষভাগে বাসরাহতে মিম্বারে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, তোমরা তোমাদের সওমের সাদাকা প্রদান করো। লোকেরা হয়ত বিষয়টি অবগত ছিল না। তিনি বললেন, এখানে মদীনাবাসী কেউ আছে কি? তোমরা তোমাদের ভাইদের কাছে গিয়ে তাদেরকে এ বিষয়ে শিক্ষা দাও। কেননা তারা (ফিতরাহ সম্পর্কে) অজ্ঞ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতরাহ নির্ধারণ করেছেন মাথাপিছু এক সা’ খেজুর বা যব বা অর্ধ সা’ গম স্বাধীন কিংবা গোলাম, পুরুষ অথবা নারী, ছোট অথবা বড়- সকলের পক্ষ হতে। পরবর্তীতে ’আলী (রাঃ) বাসরাতে এসে জিনিসপত্রের দাম খুবই কম দেখে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রাচুর্য দান করেছেন। সুতরাং তোমরা প্রত্যেক বস্ত্ত হতে এক সা’ প্রদান করো (এটাই ভাল হয়)। -আবু দাউদ: ১৬২২

كنا نؤدي زكاة الفطر على عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم مدين من قمح، بالمد الذي تقتاتون به. أحمد: 26936

হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. বলেন, যে মুদ (পাত্র) দ্বারা তোমরা খাদ্যবস্ত্ত গ্রহণ করে থাক এমন দুই মুদ (আধা সা) গম আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যমানায় সদকাতুল ফিতর আদায় করতাম। -মুসনাদে আহমদ, ২৬৯৩৬

মুসনাদে আহমদের উক্ত হাদীসটি সহীহ্। শায়েখ শুআইব আরনাঊত রহ. বলেন, হাদীস সহীহ্ তবে উক্ত হাদীসের সনদ হাসান। এরপর তিনি আরো ১২টি কিতাব থেকে উক্ত হাদীসের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন।

عَنْ نَافِعٍ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ، قَالَ كَانَ النَّاسُ يُخْرِجُونَ صَدَقَةَ الْفِطْرِ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صلي الله عليه وسلم صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ تَمْرٍ أَوْ سُلْتٍ أَوْ زَبِيبٍ ‏.‏ قَالَ قَالَ عَبْدُ اللهِ فَلَمَّا كَانَ عُمَرُ – رضى الله عنه – وَكَثُرَتِ الْحِنْطَةُ جَعَلَ عُمَرُ نِصْفَ صَاعِ حِنْطَةٍ مَكَانَ صَاعٍ مِنْ تِلْكَ الأَشْيَاءِ ‏

’আবদুল্লাহ ইবনু ’উমার রাযিয়াল্লাহু ’আনহুমা সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে লোকেরা মাথাপিছু এক সা’ যব কিংবা খেজুর অথবা খোসাবিহীন গম অথবা কিসমিস সাদাকাতুল ফিতর দিতো। নাফি’ (রহঃ) বলেন, ’আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, ’উমার (রাঃ) খলীফা নিযুক্ত হওয়ার পর প্রচুর পরিমাণে গম উৎপাদিত হলে ’উমার (রাঃ) ঐ বস্তুগুলোর এক সা’ এর স্থলে অর্ধ সা’ গম নির্ধারণ করলেন। -আবু দাউদ ১৬১৪ (এর সানাদ দুর্বল। সনদের মধ্যে ‘আবদুল আযীয ইবনু আবূ রাওয়াদ সম্পর্কে হাফিয ইবনে হাজার রহ. আত-তাক্বরীব গ্রন্থে বলেন, সত্যবাদী, তবে ভুল করতো।)

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ كُنَّا نُخْرِجُ إِذْ كَانَ فِينَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم زَكَاةَ الْفِطْرِ عَنْ كُلِّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ حُرٍّ أَوْ مَمْلُوكٍ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ فَلَمْ نَزَلْ نُخْرِجُهُ حَتَّى قَدِمَ مُعَاوِيَةُ حَاجًّا أَوْ مُعْتَمِرًا فَكَلَّمَ النَّاسَ عَلَى الْمِنْبَرِ فَكَانَ فِيمَا كَلَّمَ بِهِ النَّاسَ أَنْ قَالَ إِنِّي أَرَى أَنَّ مُدَّيْنِ مِنْ سَمْرَاءِ الشَّامِ تَعْدِلُ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ فَأَخَذَ النَّاسُ بِذَلِكَ ‏.‏ فَقَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَأَمَّا أَنَا فَلَا أَزَالُ أُخْرِجُهُ أَبَدًا مَا عِشْتُ

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, যতদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে ছিলেন, আমরা ফিতরাহ দিতাম- প্রত্যেক ছোট, বড়, স্বাধীন ও গোলামের পক্ষ হতে মাথাপিছু এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ পনির অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ কিসমিস। আমরা এ নিয়মেই ফিতরাহ দিয়ে আসছিলাম। অবশেষে মু’আবিয়াহ (রাঃ) হজ্জ কিংবা ’উমরাহ্ করতে এসে মিম্বারের আরোহন করে ভাষণ দানকালে লোকদেরকে বললেন, আমার মতে সিরিয়ার দুই মুদ্দ গম এক সা’ খেজুরের সমান। ফলে লোকেরা তাই গ্রহণ করলো। কিন্তু আবূ সাঈদ (রাঃ) বলেন, আমি যত দিন বেঁচে থাকি সর্বদা এক সা’ ফিতরাহই দিবো। -আবু দাউদ ১৬১৬

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ إِذْ كَانَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم – صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ فَلَمْ نَزَلْ نُخْرِجُهُ حَتَّى قَدِمَ مُعَاوِيَةُ الْمَدِينَةَ فَتَكَلَّمَ فَكَانَ فِيمَا كَلَّمَ بِهِ النَّاسَ إِنِّي لأَرَى مُدَّيْنِ مِنْ سَمْرَاءِ الشَّامِ تَعْدِلُ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ ‏.‏ قَالَ فَأَخَذَ النَّاسُ بِذَلِكَ ‏.‏ قَالَ أَبُو سَعِيدٍ فَلاَ أَزَالُ أُخْرِجُهُ كَمَا كُنْتُ أُخْرِجُهُ ‏.‏

قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.‏ وَالْعَمَلُ عَلَى هَذَا عِنْدَ بَعْضِ أَهْلِ الْعِلْمِ يَرَوْنَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ صَاعًا ‏.‏ وَهُوَ قَوْلُ الشَّافِعِيِّ وَأَحْمَدَ وَإِسْحَاقَ ‏.‏ وَقَالَ بَعْضُ أَهْلِ الْعِلْمِ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَغَيْرِهِمْ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ صَاعٌ إِلاَّ مِنَ الْبُرِّ فَإِنَّهُ يُجْزِئُ نِصْفُ صَاعٍ ‏.‏ وَهُوَ قَوْلُ سُفْيَانَ الثَّوْرِيِّ وَابْنِ الْمُبَارَكِ وَأَهْلِ الْكُوفَةِ يَرَوْنَ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ ‏.‏

আবু সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আমরা (মাথাপিছু) এক সা খাবার অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা খেজুর অথবা এক সা’ কিশমিশ অথবা এক সা’ পনির (ফিত্রা হিসাবে) দান করতাম। আমরা এভাবেই দিয়ে আসছিলাম। কিন্তু মুআবিয়া (রাঃ) মদীনায় এসে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে লোকদের সাথে আলোচনা করলেন। তার আলোচনার মধ্যে একটি ছিলঃ আমি দেখছি, সিরিয়ার দুই মুদ গম এক সা খেজুরের সমান। বর্ণনাকারী বলেন, তারপর লোকেরা এটাই অনুসরণ করতে লাগলো। আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, কিন্তু আমি পূর্বের মতই দিতে থাকব।

আবু ঈসা হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। এ হাদীসের অনুসরণ করে একদল মনীষী বলেন, প্রতিটি জিনিস এক সা’ পরিমাণ হতে হবে। একই রকম মত প্রকাশ করেছেন ইমাম শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একদল বিশেষজ্ঞ সাহাবা ও অন্যান্যরাও বলেছেন, এক সা’ পরিমাণই প্রতিটি জিনিস হতে হবে কিন্তু গম অর্ধ সা’ পরিমাণ দিলেই যথেষ্ট। সুফিয়ান সাওরী, ইবনুল মুবারাক ও কুফাবাসীদের মত এটাই যে, গম অর্ধেক সা’ পরিমাণ দিলেই চলবে। -তিরমিযী ৬৭৩

باب مَنْ رَوَى نِصْفَ، صَاعٍ مِنْ قَمْحٍ

قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ صَاعٌ مِنْ بُرٍّ أَوْ قَمْحٍ عَلَى كُلِّ اثْنَيْنِ صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ حُرٍّ أَوْ عَبْدٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى أَمَّا غَنِيُّكُمْ فَيُزَكِّيهِ اللهُ وَأَمَّا فَقِيرُكُمْ فَيَرُدُّ اللهُ عَلَيْهِ أَكْثَرَ مِمَّا أَعْطَاهُ ‏”‏ ‏

অর্ধ সা’ গম ফিতরাহ দেয়ার বর্ণনা

’আবদুল্লাহ ইবনু আবূ সু’আইর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ছোট, বড়, স্বাধীন, গোলাম, পুরুষ অথবা নারী প্রত্যেক দুইজনের উপর এক সা’ গম (ফিতরাহ) নির্ধারিত। আল্লাহ তোমাদের ধনীদেরকে এর দ্বারা পবিত্র করবেন এবং তোমাদের দরিদ্রদেরকে আল্লাহ তাদের দানের চাইতে অধিক দিবেন। সুলায়মান তার বর্ণনায় ’ধনী ও দরিদ্র’ শব্দ বৃদ্ধি করেছেন। -আবু দাউদ ১৬১৯ (সনদে নু‘মান বিন রাশিদ এর কারণে দুর্বলতা রয়েছে।)

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ ثَعْلَبَةَ بْنِ صُعَيْرٍ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ قَامَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم خَطِيبًا فَأَمَرَ بِصَدَقَةِ الْفِطْرِ صَاعِ تَمْرٍ أَوْ صَاعِ شَعِيرٍ عَنْ كُلِّ رَأْسٍ زَادَ عَلِيٌّ فِي حَدِيثِهِ أَوْ صَاعِ بُرٍّ أَوْ قَمْحٍ بَيْنَ اثْنَيْنِ

সা’লাবাহ ইবনু সু’আইর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ভাষণ দানকালে নির্দেশ দিলেন, ফিতরাহ মাথাপিছু এক সা’ যব। ’আলী ইবনুল হাসান তার বর্ণনায় বলেন, অথবা প্রতি দুইজনে এক সা’ গম। -আবু দাউদ ১৬২০ (সহীহ্, হাদীসবিডি)

عَنِ الْحَسَنِ، قَالَ خَطَبَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَحِمَهُ اللهُ فِي آخِرِ رَمَضَانَ عَلَى مِنْبَرِ الْبَصْرَةِ فَقَالَ أَخْرِجُوا صَدَقَةَ صَوْمِكُمْ فَكَأَنَّ النَّاسَ لَمْ يَعْلَمُوا فَقَالَ مَنْ هَا هُنَا مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ قُومُوا إِلَى إِخْوَانِكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم هَذِهِ الصَّدَقَةَ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ أَوْ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ قَمْحٍ عَلَى كُلِّ حُرٍّ أَوْ مَمْلُوكٍ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى صَغِيرٍ أَوْ كَبِيرٍ فَلَمَّا قَدِمَ عَلِيٌّ – رضى الله عنه – رَأَى رُخْصَ السِّعْرِ قَالَ قَدْ أَوْسَعَ اللهُ عَلَيْكُمْ فَلَوْ جَعَلْتُمُوهُ صَاعًا مِنْ كُلِّ شَىْءٍ ‏.‏ قَالَ حُمَيْدٌ وَكَانَ الْحَسَنُ يَرَى صَدَقَةَ رَمَضَانَ عَلَى مَنْ صَامَ ‏

হাসান বসরী (রহঃ) সূত্রে বর্ণিত। একদা ইবনু ’আব্বাস (রাঃ) রমাযানের শেষভাগে বাসরাহতে মিম্বারে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, তোমরা তোমাদের সওমের সাদাকা প্রদান করো। লোকেরা হয়ত বিষয়টি অবগত ছিল না। তিনি বললেন, এখানে মদীনাহবাসী কেউ আছে কি? তোমরা তোমাদের ভাইদের কাছে গিয়ে তাদেরকে এ বিষয়ে শিক্ষা দাও। কেননা তারা (ফিতরাহ সম্পর্কে) অজ্ঞ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতরাহ নির্ধারণ করেছেন মাথাপিছু এক সা’ খেজুর বা যব বা অর্ধ সা’ গম স্বাধীন কিংবা গোলাম, পুরুষ অথবা নারী, ছোট অথবা বড়- সকলের পক্ষ হতে।

পরবর্তীতে ’আলী (রাঃ) বাসরাতে এসে জিনিসপত্রের দাম খুবই কম দেখে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রাচুর্য দান করেছেন। সুতরাং তোমরা প্রত্যেক বস্ত্ত হতে এক সা’ প্রদান করো (এটাই ভাল হয়)। হুমাইদ আত-তাবীল (রহঃ) বলেন, হাসান বাসরীর মতে, কেবল সওম পালনকারীর উপর রমাযানের ফিতরাহ দেয়া ওয়াজিব। -আবু দাউদ ১৬২২

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ كُنَّا نُعْطِيهَا فِي زَمَانِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ فَلَمَّا جَاءَ مُعَاوِيَةُ وَجَاءَتْ السَّمْرَاءُ قَالَ أُرَى مُدًّا مِنْ هَذَا يَعْدِلُ مُدَّيْنِ

আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর যুগে এক সা‘ খাদ্যদ্রব্য বা এক সা‘ খেজুর বা এক সা‘ যব বা এক সা‘ কিসমিস দিয়ে সদাকাতুল ফিতর আদায় করতাম। মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর যুগে যখন গম আমদানী হল তখন তিনি বললেন, এক মুদ গম (পূর্বোক্তগুলোর) দু’ মুদ-এর সমপরিমাণ বলে আমার মনে হয়। -সহীহ্ বুখারী ১৫০৮

عَنْ نَافِعٍ أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ قَالَ أَمَرَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم بِزَكَاةِ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ قَالَ عَبْدُ اللهِ فَجَعَلَ النَّاسُ عِدْلَهُ مُدَّيْنِ مِنْ حِنْطَةٍ

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা‘ পরিমাণ খেজুর বা এক সা‘ পরিমাণ যব দিয়ে আদায় করতে নির্দেশ দেন। ‘আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, অতঃপর লোকেরা যবের সমপরিমাণ হিসেবে দু’ মুদ (অর্ধ সা‘) গম আদায় করতে থাকে। -সহীহ্ বুখারী ১৫০৭

عَنْ نَافِعٍ عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فَرَضَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم صَدَقَةَ الْفِطْرِ أَوْ قَالَ رَمَضَانَ عَلَى الذَّكَرِ وَالأُنْثَى وَالْحُرِّ وَالْمَمْلُوكِ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ فَعَدَلَ النَّاسُ بِهِ نِصْفَ صَاعٍ مِنْ بُ

ইবনু ‘উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক পুরুষ, মহিলা, আযাদ ও গোলামের পক্ষ হতে সদাকাতুল ফিতর অথবা (বলেছেন) সদাকা-ই রমাযান হিসেবে এক সা‘ খেজুর বা এক এক সা‘ যব আদায় করা ফরজ করেছেন। অতঃপর লোকেরা অর্থ সা‘ গমকে এক সা‘ খেজুরের সমমান দিতে লাগল। -সহীহ্ বুখারী ১৫১১

এসব হাদীস থেকে আমরা জানতে পারলাম, খাদ্যদ্রব্য এক সা‘ গম, আধা সা‘ গম, এক সা‘ খেজুর, কিসমিস, পনির, যব দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করা যায়।

আরো লক্ষণীয় যে, পূর্বোক্ত সহীহ্ বুখারী সহ অসংখ্য হাদীসে বলা হয়েছে, লোকেরা/সাহাবায়ে কেরাম অর্ধ সা‘ গম আদায় করতেন। যদি অর্ধ সা‘ গম দিলে সদকাতুল ফিতর আদায় না হয় তাহলে সাহাবায়ে কেরাম তা আদায় করতেন কিভাবে? এবং হযরত মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু এটার অনুমোদনই বা দেন কি করে?

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? মর্মে দলীল

হ্যাঁ, সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় করলেও আদায় হবে। নিম্নে এ সম্পর্কে দলীল উল্লেখ করা হলো,

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? সহীহ্ বুখারীতে এর উত্তর রয়েছে

সহীহ্ বুখারীতে একটি অধ্যায় রয়েছে। সেখানে ইমাম বুখারী রহ. তা‘লীকান কিছু বর্ণনা এনেছেন। নিম্নে সহীহ্ বুখারীর পূর্ণ এবারত এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর অনুবাদ উল্লেখ করা হলো:

باب الْعَرْضِ فِي الزَّكَاةِ

وَقَالَ طَاوُسٌ قَالَ مُعَاذٌ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ لِأَهْلِ الْيَمَنِ ائْتُونِي بِعَرْضٍ ثِيَابٍ خَمِيصٍ أَوْ لَبِيسٍ فِي الصَّدَقَةِ مَكَانَ الشَّعِيرِ وَالذُّرَةِ أَهْوَنُ عَلَيْكُمْ وَخَيْرٌ لِأَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَمَّا خَالِدٌ فَقَدْ احْتَبَسَ أَدْرَاعَهُ وَأَعْتُدَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَصَدَّقْنَ وَلَوْ مِنْ حُلِيِّكُنَّ فَلَمْ يَسْتَثْنِ صَدَقَةَ الْفَرْضِ مِنْ غَيْرِهَا فَجَعَلَتْ الْمَرْأَةُ تُلْقِي خُرْصَهَا وَسِخَابَهَا وَلَمْ يَخُصَّ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ مِنْ الْعُرُوضِ

পরিচ্ছেদ : পণ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাত আদায় করা

তাউস (রহঃ) বলেন, মুআয (ইবনে জাবাল) (রাঃ) ইয়ামনবাসীদেরকে বললেন, তোমরা যব ও ভুট্টার পরিবর্তে চাদর বা পরিধেয় বস্ত্র আমার কাছে যাকাত স্বরূপ নিয়ে এস। ওটা তোমাদের পক্ষেও সহজ এবং মদীনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীগণের জন্যও উত্তম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) এর ব্যাপার হলো এই যে, সে তার বর্ম ও যুদ্ধাস্ত্র আল্লাহর পথে ওয়াকফ করে দিয়েছে। (মহিলাদের লক্ষ্য করে) নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা তোমাদের অলংকার থেকে হলেও সাদকা কর।

[ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন,] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পণ্যদ্রব্যের যাকাত সেই পণ্য দ্বারাই আদায় করতে হবে এমন নির্দিষ্ট করে দেননি। তখন মহিলাগণ কানের দুল ও গলার হার খুলে দিতে আরম্ভ করলেন, [ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন,] সোনা ও রূপার বিষয়টি পণাদ্রব্য থেকে পৃথক করেননি (বরং উভয় প্রকারেই যাকাত স্বরূপ গ্রহন করা হত)।”

সহীহ্ বুখারীর উক্ত বর্ণনায় দেখা যাচ্ছে, মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু সদকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে যব ও ভূট্টার পরিবর্তে চাদর এবং পরিধেয় বস্তু গ্রহণ করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এটা তোমাদের জন্য আদায় করা সহজ আবার মদীনায় সাহাবীদের জন্যও তা উত্তম।

আর এটা পরিস্কার যে, হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদ্যদ্রব আর গম, খেজুর, কিসমিস, যব, পনির দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে বলেছেন। তথাপি হযরত মুআয রাযিয়াল্লাহু এগুলোর পরিবর্তে চাদর আর বস্ত্র গ্রহণ করেছেন।

তাহলে এখান থেকে এটা স্পষ্ট যে, টাকা দিয়েও সদকাতুল ফিতর আদায় করা যাবে। যেহেতু চাদর ও পরিধেয় বস্ত্র দিয়ে তাদের পক্ষে সদকাতুল ফিতর আদায় করা সহজ এবং গ্রহীতাদের প্রয়োজনও ছিল, তাই আমাদের জন্যও টাকা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করা সহজ এবং গ্রহীতাদের জন্য তার প্রয়োজনও বেশি।

চাউল দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করলে হবে?

পূর্বের আলোচনা ভালোভাব পড়ে থাকলে আপনি ইতিমধ্যে উত্তর পেয়ে গেছেন। অর্থাৎ চাউল দিয়েও সদকাতুল ফিতর আদায় করলে আদায় হবে। কারণ, হাদীসে খাদ্যদ্রব্য দিয়েও সদকা আদায়ের কথা বলা হয়েছে। আর চাউল আমাদের খাদ্যদ্রব্য।

তবে আমরা কিন্তু সাহাবীদের চাইতে হাদীস বেশি বুঝতে পারবো না। সাহাবীগণ তো সরাসরি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীস শুনেছেন। তাদের বুঝ অবশ্য আমাদের চাইতে অনেক বেশি। তাই যদি হয়, তাহলে আপনি সহীহ্ বুখারীর পূর্বোক্ত বর্ণনার দিকে তাকালে আপনি নিজেই বলতে বাধ্য হবেন যে, গরীবের চাহিদা ও প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ রাখা দাতার একান্ত দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

যেকারণে হযরত মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু সদকাতুল ফিতর হিসেবে যব, ভূট্টার পরিবর্তে কাপড় নিয়েছেন। তাই যদিও চাউল দিয়ে ফিতরা দিলে আদায় হয়ে যাবে, তথাপি আমাদের উচিৎ হবে যাকে আমি সদকাতুল ফিতর দিব তার প্রয়োজন বেশি কোন্ জিনিসের? চাউল হলে তাকে চাউল দিন। গম হলে গম বা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য। আর যদি তার প্রয়োজন থাকে টাকার তাহলে তাকে টাকাই দিন।

আরেকটি বিষয় হলো, আমরা সবাই সদকাতুল ফিতর আদায় করার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন হিসাবটা করে থাকি। এটাও ভুল। হাদীসে ৫ রকমের খাদ্যদ্রব্যের কথা বলা হয়েছে কিংবা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য। আমাদের উচিৎ, সাধ্যানুযায়ী বেশি মূল্যের সদকাতুল ফিতর আদায় করা।

এখান থেকে ঐ বিাবদও আশা করি দূর হয়ে যাবে যে, গম এর হিসেবে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে চাইলে এক সা‘ গম নাকি আধা সা‘ গম? কোনটির হিসাব করব? যেহেতু হাদীসে আধা সা‘ গমের উল্লেখ আছে যেমনটি আমরা পূর্বের আলোচনায় উল্লেখ করেছি তথাপি যদি আপনার মত হয় এক সা‘ গম (আর এটাও হাদীসে বর্ণিত আছে) এর হিসেব করতে হবে তাহলে আপনি তা পালন করতে থাকুন। এক সা‘ গমের মধ্যে তো আধা সা‘ গমও আছে। এটা নিয়ে বিবাদ করার কিছু নেই। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে সহীহ্ বুঝ দান করুন, আমীন।

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? ইমাম বুখারী রহ. এর মত কি?

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? এক্ষেত্রে ইমাম বুখারী রহ. এর মত হলো, সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় করলে আদায় হবে। যেকারণে তিনি অধ্যায়ই তৈরী করেছেন “পণ্যদ্রব্য দ্বারা যাকাত আদায় করা”।

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? প্রশ্নের উত্তরে ইমাম বুখারী রহ. হানাফীদের সহমত পোষণ করেছেন

হাফেয ইবনে রুশাইদ রহ. বলেন, উক্ত মাসআলার ক্ষেত্রে ইমাম বুখারী রহ. হানাফীদের সহমত পোষণ করেছেন। -ফাতহুল বারী, ৩/৩৫৪

আরবী পাঠ নিম্নে উল্লেখ করা হলো,

فتح الباري شرح صحيح البخاري 3/354 دار الحديث القاهرة

قوله (باب العرض في الزكاة) أي جواز أخذ العرض و هو بفتح المهملة وسكون الراء بعدها معجمة والمرادبه ما عدا النقدين، قال ابن رشيد: وافق البخاري في هذه المسئلة الحنفية مع كثرة مخالفته لهم.

عمدة القاري شرح صحيح البخاري 6/433 دار الفكر

احتج به أصحابنا في جوازد فع القيم في الزكوات’ ولهذا قال ابن رشيد : وافق البخاري في هذه المسئلة الحنفية مع كثرة مخالفته لهم.

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? সাহাবাতাবেঈনের আমল

المصنف لإبن ابي شيبة 6/507 (داراليسر دارالمنهاج) في إعطاء الدرهم في زكاة الفطر

وكيع عن قرة قال : جاءنا كتاب عمربن عبدالعزيز في صدقة الفطر : نصف صاع عن كل أنسان أوقيمته: نصف درهم . (10470)

وكيع عن سفيان عن هشام عن الحسن قال : لابأس ان تعطي الدراهم في صدقة الفطر. (10471)

أبو أسامة عن زهير قال: سمعت أبا إسحاق يقول : أدركتهم وهم يعطون في صدقة رمضان الدراهم بقيمة الطعام. (10472)

অর্থ :

  • হযরত কুররাহ রহ. বলেন, আমাদের কাছে সদকাতুল ফিতর আদায়ের ক্ষেত্রে খলীফা উমর ইবনে আব্দুল আযীয রহ. এর চিঠি আসে যে, প্রত্যেক ব্যক্তি অর্ধ সা‘ বা তার মূল্য প্রদান করবে। -মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, ১০৪৭০
  • হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন, সদকাতুল ফিতর টাকা দ্বারা আদায় করতে কোন সমস্যা নেই। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, ১০৪৭১
  • হযরত আবু ইসহাক রহ. বলেন, আমি সাহাবায়ে রেকামকে এ অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা খাবারের মূল্য হিসেবে টাকা দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করতেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, ১০৪৭২

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? আরব বিশ্বের বিখ্যাত মুফতী শায়েখ মুস্তফা যারকা রহ. এর ফাতাওয়া

শায়েখ মুস্তফা যারকা রহ. বলেন, হাদীসে নববীর রূহ বা মৌলিক আবেদন এটাই যে, সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় করবে। কারণ, ঈদের দিন গরীবের টাকারই বেশি দরকার। এর দ্বারা দরিদ্র ব্যক্তি তার অন্যান্য প্রয়োজনও সহজে পূরণ করতে পারে। -ফাতাওয়া মুস্তফা যারকা ১৪৭-১৫৩ (দারুল কলম)

فتاوى مصطفى الزرقا  147-153دار القلم

فإذا تغير الحال، وأصبحت النقود متوافرة والأطعمة غير متوافرة، أو أصبح الفقير غير محتاج اليها في العيد، بل محتاجا إلى أشياء  أخرى لنفسه، أو لعياله، كان إخراج القيمة نقدا هواالأيسر على المعطى، والأنفع للآخذ، وكان هذا عملا بروح التوجيه النبوى، ومقصوده.

সদকাতুল ফিতর টাকা দিয়ে আদায় হবে কি না? প্রশ্নের উত্তরের সারকথা

হাদীসে বর্ণিত বস্তু এবং খাদ্যদ্রব্য দিয়ে সদকাতুল ফিতর আদায় করলে আদায় হবে। তেমনিভাবে টাকা দ্বারাও সদকাতুল ফিতর আদায় করলে আদায় হয়ে যাবে। যেহেতু বর্তমানে দরিদ্র ব্যক্তির টাকা হলেই তার জন্য বেশি উপকার হয়, নিজের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করতে পারে তাই উলামায়ে কেরাম টাকা দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করার কথা বলেন। তথাপি অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য দ্বারাও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে নিষেধ করেন না।

المصادر والمراجع

  1. إنعام الباري  شرح صحيح البخاري 5/82-83 أشرفي بك دفو
  2. الأصل للامام محمد 2/180 دارابن حزم
  3. مختصر اختلاف العلماء 1/475 دار البشائر الاسلامية
  4. شرح مختصر الطحاوي2/364-369 دار البشائر الأسلامية
  5. شرح الجامع الصغير 1/308 مكتبة إسماعيل
  6. كتاب المبسوط 3/119 دار الكتب العلمية
  7. فتاوى مصطفى الزرقا 147-153دار القلم
  8. تحفة الفقهاء 1/400
  9. بدائع الصنائع 2/205
  10. خلاصة الفتاوى 1/275
  11. المحيط البرهانى 3/385
  12. الفتاوى الولوالجية 1/247
  13. الفتاوى السراجية 158
  14. المختار للفتوى 165
  15. الاختيار لتعليل المختار1/389
  16. جامع الرموز 1/342
  17. البناية شرح الهداية 3/499
  18. فتح القدير شرح الهداية 2/229
  19. الفتاوى الخانية 1/231
  20. الجوهرة النيرة 1/254
  21. الفتاوى التاتارخانية 3/455
  22. البحرالرائق 2/254
  23. النهر الفائق 1/474
  24. الدرالمختار 3/287
  25. ردالمحتار3/287
  26. الفتاوى الهندية 1/192
  27. الفقه الحنفى في ثوبه الجديد 1/376
  28. إعلاء السنن 6/2830
  29. التجريد 3/1425
  30. الفقه الإسلامي3/60
  31. فتاوى دار العلوم 6/306
  32. امداد الفتاوى 4/109
  33. امداد الاحكام 2/38-40
  34. فتاوى حقانية 4/40
  35. فتاوى محمودية 14/375

আহলে সালাফ মিডিয়া সার্ভিসের সাথে থাকার জন্য জাযাকাল্লাহ্।

Check Also

আল্লাহু আকবার বাক্যে আলিফ অথবা ‘বা’ টেনে পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে কি?

প্রশ্ন :  আল্লাহু আকবার বাক্যে আলিফ অথবা ‘বা’ টেনে পড়লে নামাজ ভেঙ্গে যাবে কি? জনৈক …

সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ৪

সালাফী আকীদা; মহান আল্লাহর আরেকটি বিশেষণ আরশের উপর ইসতিওয়া সালাফী আকীদা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় সামনে আসে, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!