প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায পড়ার বিধান কি? হুজুর! আমি মুহা. আজহারুল ইসলাম। আমরা ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি, আমাদের মসজিদগুলোতে রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায পড়া হয়।
অর্থাৎ, ইমাম সাহেব বিজোর রাতগুলোতে ২০ রাকাত তারাবীহ্ শেষ করে বিতর এর আগে ঘোষণা করেন, আজ বিজোড় রাত। আর বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায পড়তে হয়। সুতরাং আপনারা সবাই দুই রাকাত শবে কদরের নামায পড়ুন।
বর্তমানে অবস্থা এ পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, ইমাম সাহেব যদি মুসল্লিদেরকে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায পড়তে সুযোগ না দেন তাহলে ইমাম সাহেবকে টর্চার করা হয়। এখন ইমাম সাহেব বাধ্য হয়ে মুসল্লিদেরকে শবে কদরের নামায পড়ার সুযোগ করে দেন।
আমার জানার বিষয় হলো, এভাবে বিতর এর আগে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায কি বাধ্যতামূলক? হাদীস ও আছারে সাহাবায় কিংবা আকাবির-আসলাফের আমলী নমুনা কি এমনটি পাওয়া যায়? কুরআন-সুন্নাহ্ ও ফিক্বহে ইসলামীর আলোকে উত্তর দিয়ে কৃতজ্ঞ করবেন বলে আশা রাখি।
আল্লাহ্ তায়ালা আপনাদের মঙ্গল করুন। সিহহত ও আফিয়াতের যিন্দেগী নসীব করিুন। ইলম-আমলে বরকত দান করুন। আমীন।
উত্তর :
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায
বিষয়টি আপনি যেভাবে বলেছেন বাস্তবে তাই হচ্ছে। বরং দিন দিন এ বিষয়টি আরো প্রকোট আকার ধারণ করছে। আমাদের কাছে আপনি ছাড়াও প্রশ্নটি বারবার একাধিক ব্যক্তি থেকে আসছে।
প্রথমত আমরা লাইলাতুল কদর বা শবে কদরের পরিচিতি ও তার গুরুত্ব ও ফযীলত আপনার সামনে তুলে ধরতে চাই। যাতে শবে কদরের হাকীকত আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠে।
লাইলাতুল কদর : গুরুত্ব ও ফযীলত
রমযানের পুরো মাস জুড়ে বিরাজ করে রহমত বরকত এবং ক্ষমার ঘোষণা। তবে এ মাসে রয়েছে বিশেষ এক মহিমান্বিত রজনী- লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা এ রাতের ব্যাপারে বলেন-
لَیْلَةُ الْقَدْرِخَیْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَهْرٍ. تَنَزَّلُ الْمَلٰٓىِٕكَةُ وَ الرُّوْحُ فِیْهَا بِاِذْنِ رَبِّهِمْۚ مِنْ كُلِّ اَمْرٍ، سَلٰمٌ ، هِیَ حَتّٰی مَطْلَعِ الْفَجْرِ۠.
সেই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতরণ করেন প্রত্যেক কাজে তাদের রবের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত। -সূরা কদর (৯৭) : ৩-৫
লাইলাতুল কদর : যে রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে
اِنَّاۤ اَنْزَلْنٰهُ فِیْ لَیْلَةِ الْقَدْرِ.
নিশ্চয়ই আমি কদর রজনীতে কুরআন অবতীর্ণ করেছি। -সূরা কদর (৯৭) : ১
اِنَّاۤ اَنْزَلْنٰهُ فِیْ لَیْلَةٍ مُّبٰرَكَةٍ اِنَّا كُنَّا مُنْذِرِیْنَ.
আমি এ (কিতাব) অবতীর্ণ করেছি বরকতপূর্ণ রজনীতে, বস্তুত আমি সতর্ককারী। -সূরা দুখান (৪৪) : ৩
এখানে লাইলাতুম মুবারকা বা বরকতময় রজনী বলতে শবে কদর বুঝানো হয়েছে। তো কদর রজনী একদিকে যেমন মহিমান্বিত অপরদিকে তা অত্যন্ত বরকতপূর্ণও বটে।
লাইলাতুল কদর : যে রাতে গুনাহ মাফ হয়
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ. بخاري: 2014
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রমাযানে ঈমানের সাথে ও সওয়াব লাভের আশায় সওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয় এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে, সওয়াব লাভের আশায় লাইলাতুল কদরে রাত জেগে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হয়। সুলায়মান ইবনু কাসীর (রহ.) যুহরী (রহ.) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। -সহীহ্ বুখারী ২০১৪
লাইলাতুল কদর থেকে বঞ্চিত হওয়া অনেক বড় মাহরূমী
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ دَخَلَ رَمَضَانُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الْخَيْرَ كُلَّهُ وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ. ابن ماجه: 1644
যে ব্যক্তি এর কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হল সে যেন সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল। আর কেবল অভাগাই এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে। -সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪৪
একারণেই হয়ত নবীজী শেষ দশকে ইবাদত বাড়িয়ে দিতেন
عن عائشة رضي الله عنها قالت: كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيره. مسلم: 1175
’আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাযান (রমজান) মাসের শেষ দশ দিনে যত ’ইবাদাত বন্দেগী (মুজাহাদাহ্) করতেন এতো আর কোন মাসে করতেন না। -মুসলিম ১১৭৫
عن عائشة رضي الله عنها قالت كان رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا دخل العشر أحيا الليل وأيقظ أهله وجد وشد المئزر. مسلم: 1174
রমযানের শেষ দশক শুরু হলে নবীজী পূর্ণ রাত্রি জাগরণ করতেন। পরিবারের সবাইকে জাগিয়ে দিতেন এবং নিজে কোমর বেঁধে ইবাদতে মগ্ন হতেন। -মুসলিম ১১৭৪
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم “صَلاَةُ الرَّجُلِ فِي جَمَاعَةٍ تَزِيدُ عَلَى صَلاَتِهِ فِي بَيْتِهِ وَصَلاَتِهِ فِي سُوقِهِ بِضْعًا وَعِشْرِينَ دَرَجَةً وَذَلِكَ أَنَّ أَحَدَهُمْ إِذَا تَوَضَّأَ فَأَحْسَنَ الْوُضُوءَ ثُمَّ أَتَى الْمَسْجِدَ لاَ يَنْهَزُهُ إِلاَّ الصَّلاَةُ لاَ يُرِيدُ إِلاَّ الصَّلاَةَ فَلَمْ يَخْطُ خَطْوَةً إِلاَّ رُفِعَ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ وَحُطَّ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ حَتَّى يَدْخُلَ الْمَسْجِدَ فَإِذَا دَخَلَ الْمَسْجِدَ كَانَ فِي الصَّلاَةِ مَا كَانَتِ الصَّلاَةُ هِيَ تَحْبِسُهُ وَالْمَلاَئِكَةُ يُصَلُّونَ عَلَى أَحَدِكُمْ مَا دَامَ فِي مَجْلِسِهِ الَّذِي صَلَّى فِيهِ يَقُولُونَ اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ اللَّهُمَّ تُبْ عَلَيْهِ مَا لَمْ يُؤْذِ فِيهِ مَا لَمْ يُحْدِثْ فِيهِ” . مسلم: 649
আবূ হুরায়রাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন ব্যক্তি মসজিদে জামা’আতের সাথে সালাত আদায় করলে তা তার বাড়ীতে বা বাজারে সালাত আদায় করার চেয়ে বিশগুণেরও অধিক মর্যাদা সম্পন্ন। কারণ কোন লোক যখন সালাতের জন্য ওযু করে এবং ভালভাবে ওযু করে মসজিদে আসে তাকে সালাত ছাড়া আর কিছুই মসজিদে আনে না; আর সে সালাত ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্যও পোষণ করে না।
সুতরাং এ উদ্দেশে সে যখনই পদক্ষেপ করে তখন থেকে মসজিদে প্রবেশ না করা পর্যন্ত তার প্রতিটি নেকীর বদলে ঐ ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় এবং একটি করে পাপ মিটিয়ে দেয়া হয়। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করার পর যতক্ষণ সে সালাতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে ততক্ষণ যেন সে সালাতরত থাকে। আর তোমাদের কেউ যখন সালাত আদায় করার পর সালাতের স্থানেই বসে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মালায়িকাহ (ফেরেশতাগণ) তার জন্য এ বলে দু’আ করতে থাকে যে, হে আল্লাহ! তুমি তার তওবা কবুল করো। এরূপ দুআ ততক্ষণ পর্যন্ত করতে থাকে যতক্ষণ না সে কাউকে কষ্ট দেয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত ওযু নষ্ট না করে।
যেভাবে লাভ করতে পারি শবে কদরের ন্যূনতম ফযীলত
عن عثمان بن عفان رضي الله عنه قال سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول من صلى العشاء في جماعة فكأنما قام نصف الليل ومن صلى الصبح في جماعة فكأنما صلى الليل كله. مسلم: 656
উসমান ইবনে আফ্ফান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি জামাতের সাথে এশার নামায আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত পর্যন্ত কিয়াম (ইবাদত) করল। আর যে ফজরের নামায জামাতসহ আদায় করল, সে যেন সারা রাত নামায পড়ল।” –মুসলিম ৬৫৬
শবে কদরে কী দুআ করব?
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَىُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ الْقَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا قَالَ “قُولِي اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيمٌ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي ” . قَالَ هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ . ترمذي: 3513
তাৎপর্যপূর্ণ এ দুআটি কেবল লাইলাতুল কদরের জন্যই নির্ধারিত নয়। পুরো রমযানেই, ইফতারীর সময়, সাহরীর সময় এবং অন্যান্য সময়েও পড়া যায়। এমনকি রমযান ছাড়াও এ দুআ পড়া যায়। নবীজীর শেখানো দুআ যত পড়া যায় ততই লাভ। -তিরমিযী ৩৫১৩
লাইলাতুল কদরের তালাশে…
عَنْ أَبِي سَلَمَةَ قَالَ سَأَلْتُ أَبَا سَعِيدٍ وَكَانَ لِي صَدِيقًا فَقَالَ اعْتَكَفْنَا مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم الْعَشْرَ الأَوْسَطَ مِنْ رَمَضَانَ فَخَرَجَ صَبِيحَةَ عِشْرِينَ فَخَطَبَنَا وَقَالَ إِنِّي أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أُنْسِيتُهَا أَوْ نُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِي الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ فِي الْوَتْرِ وَإِنِّي رَأَيْتُ أَنِّي أَسْجُدُ فِي مَاءٍ وَطِينٍ فَمَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَلْيَرْجِعْ فَرَجَعْنَا وَمَا نَرَى فِي السَّمَاءِ قَزَعَةً فَجَاءَتْ سَحَابَةٌ فَمَطَرَتْ حَتَّى سَالَ سَقْفُ الْمَسْجِدِ وَكَانَ مِنْ جَرِيدِ النَّخْلِ وَأُقِيمَتْ الصَّلاَةُ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَسْجُدُ فِي الْمَاءِ وَالطِّينِ حَتَّى رَأَيْتُ أَثَرَ الطِّينِ فِي جَبْهَتِهِ. بخاري: 2016
আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে রমাযানের মধ্যম দশকে ই‘তিকাফ করি। তিনি বিশ তারিখের সকালে বের হয়ে আমাদেরকে সম্বোধন করে বললেনঃ আমাকে লাইলাতুল ক্বদর (-এর সঠিক তারিখ) দেখানো হয়েছিল পরে আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাতে তার সন্ধান কর। আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি (ঐ রাতে) কাদা-পানিতে সিজদা করছি।
অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সঙ্গে ই‘তিকাফ করেছে সে যেন ফিরে আসে (মসজিদ হতে বের হয়ে না যায়)। আমরা সকলে ফিরে আসলাম (থেকে গেলাম)। আমরা আকাশে হাল্কা মেঘ খন্ডও দেখতে পাইনি। পরে মেঘ দেখা দিল ও এমন জোরে বৃষ্টি হলো যে, খেজুরের শাখায় তৈরি মসজিদের ছাদ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। সালাত শুরু করা হলে আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে কাদা-পানিতে সিজদা করতে দেখলাম। পরে তাঁর কপালে আমি কাদার চিহ্ন দেখতে পাই। -সহীহ বুখারী ২০১৬
সহীহ্ বুখারীর ২০২৭ নম্বরে হাদীসে সেই রাতটিকে বলা হয়েছে ২১তম রাত।
فَمَطَرَتْ السَّمَاءُ تِلْكَ اللَّيْلَةَ وَكَانَ الْمَسْجِدُ عَلَى عَرِيشٍ فَوَكَفَ الْمَسْجِدُ فَبَصُرَتْ عَيْنَايَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى جَبْهَتِهِ أَثَرُ الْمَاءِ وَالطِّينِ مِنْ صُبْحِ إِحْدَى وَعِشْرِينَ
সুতরাং শবে কদরের ফযীলত লাভে সচেষ্ট হওয়া কর্তব্য। এ রাতে সাধ্য মোতাবেক নফল ইবাদত করবে, তিলাওয়াত, যিকির, দুআ, ইস্তেগফার, দরূদ প্রভৃতিতে মগ্ন থাকবে। ইবাদতের মাঝে বিশ্রাম নিলেও দিল আল্লাহমুখী রাখবে, সম্ভব হলে মনে মনে যিকির করবে। তবে হাঁ, যদি বেশি বিশ্রামের প্রয়োজন থাকে, তাহলে বিশ্রামও করা যেতে পারে, কিন্তু গাফলতের ঘুম বা কেবল আরামের ঘুম ঘুমাবে না। আর খেয়াল করে এশা ও ফজর নামায অবশ্যই জামাতের সাথে পড়বে।
কিন্তু শবে কদর কবে, তা নির্দিষ্ট নেই। শুধু এতটুকু জানানো হয়েছে যে, শবে কদর রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর যেকোনো একদিন। তাই শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর প্রতিদিনই ইবাদত করা কর্তব্য। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলোতে শবে কদর তালাশ কর। ―সহীহ বুখারী, হাদীস ২০১৭, ২০২০
শবে কদরের পূর্বোল্লিখিত হাদীসসমূহ থেকে আমরা কী পেলাম
১. শবে কদরের রাতে জিবরাইল আলাইহিস সালাম ফেরেস্তাদেরকে নিয়ে অবতরণ করেন।
২. শবে কদরের রাতে শান্তি আর কল্যাণ নিহিত। আর এটা ফজর পর্যন্ত।
৩. শবে কদরের রাতে কুরআন নাযিল করা হয়।
৪. শবে কদরের রাতে নফল নামায পড়লে আল্লাহ্ তায়ালা বান্দার পেছনের যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেন।
৫. শবে কদরে খায়ের ও কল্যাণ থেকে বন্চিত হওয়া অনেক বড় মাহরুমী।
৬. শবে কদরে অবশ্যই ইশা ও ফজর জামাতে পড়া উচিৎ। এতে সারা রাত দাঁড়িয়ে নফল নামায পড়ার সওয়াব পাওয়া যায়। তবে আমলটি সারা বছরই আমাদের করা উচিৎ।
৭. শবে কদরে গুনাহ থেকে মুক্তির বিশেষ দুআ‘ করা।
৮. বিজোড় রাতে শবে কদর তালাশ করা।
রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায প্রসঙ্গে আপনার প্রশ্নের উত্তর
এতক্ষণের আলোচনা মনোযোগ দিয়ে পড়ে থাকলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, শবে কদর সূর্য ডুবার পর থেকেই শুরু হয় এবং এটা বাকী থাকে ফজরের সময় হওয়া পর্যন্ত। তাই রমজানের শেষ দশকে বিজোড় রাতে শবে কদরের নামায বিতরের আগে দুই রাকাত পড়ে নিলে যে সমস্যাগুলো দেখা দেয় তাহলো:
১. কুরআন-হাদীস যেখানে সূর্য ডুবার পর থেকেই শবে কদর শুরু হওয়ার কথা বলছে আমরা সেটাকে তারবীর পর বিতরের আগে নিয়ে গেলাম। দরকার তো ছিল, মাগরিবের পর থেকেই নফল নামাযে মশগুল হয়ে যাওয়া। তাহলে আমরা কুরআন-হাদীসের মূল আবেদন কে নষ্ট করে দিলাম।
২. শবে কদরের নির্দিষ্ট কোন নামায নেই। আমরা দুই/চার রাকাত পড়ে শবে কদরের নামায কে নির্দিষ্ট করে ফেললাম।
৩. যেখানে কুরআন-হাদীসে ফজর পর্যন্ত নফল ইবাদতে মশগুল থাকতে বলা হয়েছে, সেখানে আমরা ৫/১০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেললাম।
৪. তারাবীর পরে বিতরের জামাতের আগে হাদীসের মধ্যে কিংবা সাহাবা-তাবেঈনের আমলে আমরা শবে কদরের জন্য দুই/চার রাকাত নামায পড়ার সুযোগ দেয়ার বিষয়টি খুজে পাই না। এটি একটি নতুন নিয়ম আমরা চালু করলাম, যার কোন ভিত্তি কুরআন-হাদীসে নেই।
৫. কুরআন-হাদীসে কদরের নামায, লাইলাতুল কদরের নামায কিংবা শবে কদরের নামায নামে কোন নামায নেই। আছে নফল নামায পড়ার কথা। তাহলে এ নামটাই আমাদের বানানো। যে কারণে এখন সাধারণ মানুষ মনে করে কদরের নামায নামে একটি নামায আছে। মানুষকে একটি ভুল পরিভাষার উপর আমরা তুলে দিলাম।
৬. সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে আমলটা ছিল ব্যক্তিগত, একাকী, সেটাকে আমরা আনুষ্ঠানিকতার রুপ দিয়ে দিলাম।
৭. আরো জটিল ও কঠিন বিষয় হলো, শরীয়তের প্রত্যেকটা আমলকে তার আপন স্তরে রাখা উচিৎ। ফরজকে ফরজের জায়গায়, ওয়াজিবকে ওয়াজিবের জায়গায়, সুন্নতকে সুন্নতের জায়গায় এবং নফলকে নফলের জায়গায়। যদি কোন একটিতেও এদিক সেদিক করা হয় তাহলে তা বিদআত হবে।
সুতরাং শবে কদরে বা লাইলাতুল কদরে নফল নামায এটা নফল ইবাদত। এটাকে যদি আবশ্যকীয় পালনীয় মনে করা হয় তাহলে তা হবে বিদআত। বর্তমানে মানুষ এটাকে আবশ্যকীয় মনে করছে। যে কারণে কোন ইমাম সাহেব এই নামাযের সুযোগ না দিলে তাকে জবাবদিহি করতে হয়।
অতএব, এই আমল পরিত্যাজ্য। বরং সঠিক নিয়ম হলো, তারাবীহ ও বিতির যথা নিয়মে আদায় করবে। এরপর ইমাম সাহেব বিজোড় রাতের কথা স্বরণ করিয়ে দিবে। অত:পর মুসল্লিরা চাইলে মসজিদেও নফল ইবাদত করতে পারে। চাইলে ঘরে গিয়ে ও করতে পারে।
অনেকেই আবার বলে থাকেন, এভাবে ছেড়ে দিলে তো আর কদরের নামায পড়াই হয় না।
এ প্রশ্নের উত্তর পূর্বে হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এটা কোন বাধ্যতামূলক আমল নয় যে, তা বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে পড়াতে হবে। এটা ব্যক্তিগত আমল। যা ব্যক্তিগত ভাবেই হওয়া কাম্য। এটাকে আনুষ্ঠানিকতার রুপ দেয়া উচিৎ নয়।
তাছাড়া কোন একটা আমল সবাইকে করাতে হবে এটার শরীয়তের নিয়ম পরিবর্তন করার সুযোগ নেই। যেমন ধরুন, জুমুআর দিন জুমুআর পরের সুন্নত এখন অনেকেই আদায় করে না। তাই বলে কি খতীব সাহেব খুতবার পরে বলবেন যে, আপনারা জুমুআর পরের সুন্নত পড়ে নিন। কারণ, আপনারা জুমুআর পরে এটা না পড়েই চলেই যান।
শরীয়তের অনুসৃত পন্থা পরিবর্তন করে কোন কিছু নতুনভাবে সূচনা করার সুযোগ শরীয়ত দেয় না। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন।
আহলে সালাফ মিডিয়া সার্ভিসের সাথে থাকার জন্য অসংখ্য জাযাকাল্লাহ্।
আহলে সালাফ মিডিয়া সার্ভিস Ahle Salaf Media Service