হোম / আকিদা-বিশ্বাস / সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ৩

সালাফী আকীদা বনাম দেওবন্দী আকীদা, পর্ব- ৩

সালাফী আকীদা; আল্লাহ্ কি নিরাকার?

সালাফী আকীদা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় সামনে আসে, আল্লাহ্ কি নিরাকার? উত্তর হচ্ছে, এটা আবার বলা যাবে না যে, আল্লাহ্ নিরাকার। বরং আল্লাহ্ আকার-নিরাকার এসব কিছুর উর্দ্বে। আকার নাকি নিরাকার এই আলোচনাও বেকার। বরং এই সম্পর্কীয় আয়াত-হাদীসগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই এর প্রতি ঈমান আনা আমাদের কর্তব্য। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পিছনেই পড়া যাবে না।

সালাফের কর্মপন্থাই এটা। তারা বলতেন, এগুলো আল্লাহর সিফাত। সিফাত হিসেবে এগুলোর প্রতি ঈমান আনা আমাদের উপর জরুরী। বুঝার সুবিধার্থে ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. এর পূর্বোল্লিখিত বক্তব্যটি আবার উল্লেখ করছি। তিনি বলেন,

وأسند البيهقي بسند صحيح عن احمد بن أبي الحواري عن سفيان بن عيينة قال كل ما وصف الله به نفسه في كتابه فتفسيره تلاوته والسكوت عنه

ইমাম বাইহাকী রহ. সহীহ্ সনদে এনেছেন, ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, আল্লাহ্ তায়ালা নিজের সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে যেভাবে বর্ণনা করেছেন তার তাফসীর বা ব্যাখ্যা হলো, তা তেলাওয়াত করা এবং চুপ থাকা।  

খোন্দকার আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গির ও আল ফিকহুল আকবার

এ বিষয়ে আমার লেখা মোটামোটি ভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর খোন্দকার ড. আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গির রহ. এর ‘আল-ফিকহুল আকবার বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা’ বইটি দেখার সুযোগ হলো। দেখলাম, যে বিষয়গুলো আমি আগে পরে লিখেছি তার অনেক আলোচনা-উদ্ধৃতি এখানে রয়েছে। পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে বইটির ২৫৩-২৭৬ পুষ্ঠার আলোচনা কিছুটা পরিমার্জন ও সংক্ষিপ্তাকারে এখানে উল্লেখ করা হলো।

তবে জানা জরুরী যে, লেখক অসংখ্য জায়গায় মোল্লা আলী কারী রহ. এর শরহে ফিকহে আকবার কে সামনে রেখেছেন। অথচ মোল্লা আলী কারী রহ. এর শরাহ্ এর মূল মতনটি ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দিকে সম্বন্ধ করা হয়, কিন্তু তা সহীহ্ নয়। তাই এই বইটিতে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর দিকে সম্বন্ধিত সকল কথাই তার কথা হওয়াটা জরুরী নয়।

আরেকটি কথা। উক্ত বইটি প্রাথমিক ছাত্রদের জন্য পাঠ করা মুনাসিব নয় এবং নিরাপদও নয়। এই যে, এখানে যে আলোচনাটুকু উল্লেখ করছি, তাও কারো জন্য মূল বই থেকে পড়াটা নিরাপদ নয়। এজন্যই কিছুটা পরিমার্জন ও সংক্ষীপ্ত করে এখানে আনা হয়েছে। তাই কোন অভিজ্ঞ আলেমের তত্ত্বাবধানে থেকে আগে মৌলিক আকীদা শিখা জরুরী।

তারপর কিছুটা এস্তেফাদা এবং সর্বোচ্চ সতর্ক হয়ে বইটি পড়া যেতে পারে। তবে সেটাও মুরব্বীদের মাশওয়ারায়, কখন পড়বে এবং কিভাবে পড়বে তা জেনে নিয়ে মুতালাআ‘ করা যেতে পারে। এ সম্পর্কে মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব দা. বা. এর মাসিক আল কাউসারে দেয়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিক-নির্দেশা রয়েছে- সেটা দেখা যেতে পারে।

আমি এখানে আলোচনার কিছু অংশ এনেছি তার কারণ হলো, এখানে দুই একটি কিতাবের উদ্ধৃতি রয়েছে, যা আমার কাছে নেই। তাছাড়া বর্তমানের সালাফী ভাইদের কাছেও বইটি ব্যাপক প্রচলিত ও গৃহীত। আলোচনা দেখে হয়তো তারাও ভাবার একটু ফুরসত পেতে পারেন -ইনশআল্লাহ্। এবার বইটি থেকে আলোচনা উল্লেখ করা হলো :

আল্লাহর হস্ত, মুখমণ্ডল, সত্তা, ক্রোধ, সন্তুষ্টি

এ পরিচ্ছেদের শুরুতে ইমাম আযমের বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে :

“তিনি বিদ্যমান অস্তিত্ব, তবে অন্য কোনো সৃষ্ট বস্তু” বা “বিদ্যমান বিষয়ের মত তিনি নন। তিনি বিদ্যমান অস্তিত্ব তবে কোনো দেহ, কোনো জাওহার (মৌল উপাদান) এবং কোনো ‘আরায’ (অমৌল উপাদান) ব্যতিরেকেই। তাঁর কোনো সীমা নেই, বিপরীত নেই, সমকক্ষ নেই, তুলনা নেই। “অতএব তোমরা কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে না।” তাঁর ইয়াদ (হাত) আছে, ওয়াজহ (মুখমণ্ডল) আছে, নফস (সত্তা) আছে, কারণ আল্লাহ কুরআনে এগুলো উল্লেখ করেছেন।

কুরআনে আল্লাহ যা কিছু উল্লেখ করেছেন, যেমন মুখমণ্ডল, হাত, নফস ইত্যাদি সবই তাঁর বিশেষণ, কোনো ‘স্বরূপ’ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। এ কথা বলা যাবে না যে, তাঁর হাত অর্থ তাঁর ক্ষমতা অথবা তাঁর নিয়ামত। কারণ এরূপ ব্যাখ্যা করার অর্থ আল্লাহর বিশেষণ বাতিল করা। এরূপ ব্যাখ্যা করা কাদারিয়া ও মু’তাযিলা সম্প্রদায়ের রীতি। বরং তাঁর হাত তাঁর বিশেষণ, কোনো স্বরূপ বা প্রকৃতি নির্ণয় ব্যতিরেকে। তাঁর ক্রোধ এবং তাঁর সন্তুষ্টি তাঁর দুটি বিশেষণ, আল্লাহর অন্যান্য বিশেষণের মতই, কোনো ‘কাইফ’ বা ‘কিভাবে’ প্রশ্ন করা ছাড়াই ।”

এ বক্তব্যে তিনি মহান আল্লাহর বিশেষণ বিষয়ে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নিম্নোক্ত মূলনীতিগুলো উল্লেখ করেছেন :

আল্লাহর সিফাত: অস্তিত্ব, স্বরূপ ও তুলনা

আল্লাহর বিশেষণসমূহের বিষয়ে মুশাব্বিহা ও জাহমী সম্প্রদায়ের প্রান্তিকতার বিষয় আমরা জেনেছি। মুশাব্বিহা সম্প্রদায়ের যুক্তি নিম্নরূপ :

(১) কুরআন-হাদীসের বক্তব্য অনুসারে মহান আল্লাহর শ্রবণ, দর্শন, অবস্থান, হস্ত, চক্ষু, মুখমণ্ডল ইত্যাদি বিদ্যমান। (২) মানুষের মধ্যেও এগুলো বিদ্যমান (৩) এ সকল বিশেষণের স্বরূপ ও প্রকৃতি আল্লাহর ক্ষেত্রেও অবশ্যই মানুষের মতই। (৪) কাজেই মহান আল্লাহ মানুষের মতই দেহধারী এবং বিশেষণধারী। তারা ‘কোনো কিছুই আল্লাহর মত নয়’ মর্মের আয়াতগুলিকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা করে বাতিল করে দেন ।

জাহমিয়্যাহ-মু’তাযিলাদের যুক্তি নিম্নরূপ :

(১) মানুষের শ্রবণ, দর্শন, হস্ত, চক্ষু, মুখমণ্ডল ইত্যাদি রয়েছে। (২) এ সকল বিশেষণের স্বরূপ আল্লাহর ক্ষেত্রেও অবশ্যই মানুষের মতই হতে হবে। (৩) আল্লাহর এ সকল বিশেষণ আছে বলে বিশ্বাস করার একমাত্র অর্থ তাঁকে মানুষের সাথে তুলনীয় বলে বিশ্বাস করা। (৪) আল্লাহর অতুলনীয়ত্ব সমুন্নত রাখতে এ সকল বিশেষণ অস্বীকার, ব্যাখ্যা ও রূপক অর্থে বিশ্বাস করা ফরয ।

তাদের মতে আল্লাহর হাত অর্থ আল্লাহর ক্ষমতা বা নিয়ামত । আল্লাহর মুখমণ্ডল অর্থ আল্লাহর অস্তিত্ব বা সত্তা। ক্রোধ ও সন্তুষ্টি, মানসিক পরিবর্তন, আকর্ষণ বা বিকর্ষণ বুঝায়। মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে এগুলি প্রযোজ্য নয়। আল্লাহর ক্রোধ অর্থ শাস্তির ইচ্ছা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্থ পুরস্কারের ইচ্ছা…. ইত্যাদি।

এভাবে তারা আল্লাহর ‘অতুলনীয়ত্বে’ বিশ্বাস করার নামে আল্লাহর ওহীকে অস্বীকার করেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা ব্যাখ্যা করেন নি, তা ব্যাখ্যা করাকে তারা দীনের জন্য জরুরী বানিয়েছে। কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট বক্তব্য সরল অর্থে বিশ্বাস করাকে কুফরী বলে দাবি করেছে! সাহাবীগণ ওহীর এ সকল নির্দেশনা সরল অর্থে বিশ্বাস করেছেন।

তাঁরা ওহীর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য কল্পনা করেন নি। কারণ আল্লাহর বিশেষণকে সৃষ্টজীবের বিশেষণের সাথে তুলনা করলেই বৈপরীত্যের কল্পনা আসে। ওহীর উভয় শিক্ষাকে আক্ষরিকভাবে বিশ্বাস করলে কোনো বৈপরীত্য থাকে না। এ মতের যুক্তি নিম্নরূপ :

সঠিক মত

(১) আল্লাহর বিশেষণ ও অতুলনীয়ত্ব উভয়ই ওহীর মাধ্যমে জ্ঞাত বিষয়। (২) বিশেষণের প্রকৃতি ও স্বরূপ অজ্ঞাত। (৩) অজ্ঞাত বিষয়ের অজুহাতে ওহীর জ্ঞাত বিষয় ব্যাখ্যা বা অস্বীকার করার অর্থ ওহীকে অস্বীকার করা। (৪) এজন্য অজ্ঞাত বিষয়কে অজ্ঞাত রেখে বিশেষণ ও অতুলনীয়ত্ব উভয় জ্ঞাত বিষয় বিশ্বাস করতে হবে ।

মহান স্রষ্টার জন্য তাঁর মর্যাদার সাথে সুসমঞ্জস ও সৃষ্টির সাথে অতুলনীয় হস্ত, মুখমণ্ডল, সত্তা, ক্রোধ, সন্তুষ্টি ইত্যাদি বিশেষণ থাকা মানবীয় বুদ্ধির সাথে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়। যেহেতু তাঁর সৃষ্টির সাথে অতুলনীয় অস্তিত্ব আছে কাজেই তাঁর অস্তিত্বের সাথে সুসমঞ্জস অতুলনীয় বিশেষণাদি থাকাই স্বাভাবিক।

আহলুস সুন্নাত এক্ষেত্রে দুটি মূলনীতি অনুসরণ করেছেন:

(ক) ওহীর বক্তব্য বাহ্যিক অর্থে গ্রহণ করা এবং (খ) সাহাবীগণের অনুসরণ করা।

এ প্রসঙ্গে ইমাম আবূ হানীফার উপরের বক্তব্যের ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ শাইখ আহমদ ইবন মুহাম্মাদ মাগনীসাবী (১০০০ হি) বলেন :

أصلها معلوم ووصفها مجهول لنا، فلا يبطل الأصل المعلوم بسبب التشابه والعجز عن إدراك الوصف… قال الشيخ الإمام فخر الإسلام علي البزدوي في أصول الفقه : وكذلك إثبات اليد والوجه عندنا معلوم بأصله متشابه بوصفه، ولن يجوز إبطال الأصل بالعجز عن إدراك الوصف. وإنما ضلت المعتزلة من هذا الوجه ؛ فإنهم ردوا الأصول لجهلهم بالصفات

“এ সকল বিশেষণের মূল অর্থ জ্ঞাত কিন্তু এগুলোর বিবরণ বা ব্যাখ্যা আমাদের অজ্ঞাত। জ্ঞাত মূল বিষয়টি বিবরণের অস্পষ্টতা বা তা জানতে অক্ষম হওয়ার কারণে বাতিল করা যায় না।

ইমাম ফাখরুল ইসলাম আলী (ইবন মুহাম্মাদ) বাযদাবী ( ৪৮২ হি) ‘উসূলুল ফিকহ’ গ্রন্থে বলেন: হাত ও মুখমণ্ডল বিশ্বাস করা আমাদের নিকট তার মূল অর্থে জ্ঞাত কিন্তু তার বিবরণে দ্ব্যার্থবোধক বা অস্পষ্ট। বিবরণ জানতে অক্ষমতার কারণে মূল বিষয় বাতিল করা বৈধ নয়। এ দিক থেকেই মুতাযিলীগণ বিভ্রান্ত হয়েছে। বিবরণ বা ব্যাখ্যা না জানার কারণে তারা মূল বিষয়ই প্রত্যাখ্যান করেছে ।” –মাগনিসাবী, শরহুল ফিকহিল আকবার পৃ. ১৩-১৪; উসূলুল বাযদাবী পৃ. ১০

মুতাযিলা-জাহমিয়াদের আহলুস-সান্নহর উপর অপবাদ

মুতাযিলা-জাহমিয়াগণ সাধারণত আহলুস্ সুন্নাত-কে মুশাব্বিহা (তুলনাকারী) বা মুজাসসিমা (দেহেবিশ্বাসী) বলে অপবাদ দেন। তাদের দাবি, মহান আল্লাহর হাত, মুখমণ্ডল, চক্ষু, আরশের ঊর্ধ্বে থাকা ইত্যাদির কথা কুরআন-হাদীসে যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সেভাবে বিশ্বাস করার অর্থই তাঁকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করা এবং তাঁকে ‘দেহবিশিষ্ট’ বলে দাবী করা।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন যে, আহলুস সুন্নাত এগুলোকে বিশেষণ হিসেবে বিশ্বাস করেন এবং বিশ্বাস করেন যে, এগুলো কোনোভাবে সৃষ্টির কোনো বিশেষণের সাথে তুলনীয় নয়। এগুলোর প্রকৃতি আমরা জানি না এবং জানতে চেষ্টা করি না।

তাঁরা তুলনা অস্বীকার করেন, কারণ আল্লাহ তুলনা অস্বীকার করেছেন, কিন্তু তাঁরা তুলনা অস্বীকারের নামে মূল বিশেষণ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা করেন না, কারণ মহান আল্লাহই এ সকল বিশেষণ উল্লেখ করেছেন। তাঁকে কি বিশেষণে বিশেষিত করলে তাঁর মর্যাদা রক্ষা হয় তা তিনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। 

১ম পর্ব , ২য় পর্ব , ৪র্থ পর্ব

Check Also

রোযা ও তারাবীর মাসায়েল

রোযা ও তারাবীর মাসায়েল জানা আমাদের সবার জন্যই জরুরী।  যাতে করে আমাদের সকলের রোযাগুলো সহীহ্ …

আপনি কিভাবে তালাক দিবেন?

আপনি কিভাবে তালাক দিবেন? প্রবন্ধটি তালাকের ক্ষেত্রে একটি সহজ সরল উপস্থাপন। এতে একজন স্বামী তার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!